in ,

পুরোনো গাড়ি কেনার সময় যে বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন

গাড়ি কেনাটা সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। আপনি যখন আপনার টাকার বেশ বড় একটা অংশ খরচ করবেন, যা চাইছেন তার পুরোটা পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়েই করুন। নতুন গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে এসব ভাবনা খুব একটা প্রয়োজন হয় না। কারণ আপনি ইতোমধ্যেই জানেন কী কিনে, কী পাচ্ছেন। ভেতরে বাইরে সব কিছু প্রাথমিকভাবে সুরক্ষিতই থাকে। একই বছরের দুটো নতুন টয়োটার বাস্তবে একই রকম আদর্শিক মান থাকে। একই কথা প্রযোজ্য অন্যান্য নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এবং তাদের মডেল সম্পর্কে।

দূর্ভাগ্যবশতঃ পুরাতন গাড়ি কেনা এত সাধারণ ও সহজ নয়। একই বছরে বের হওয়া, একই ব্র্যান্ড এবং মডেলের দুটো ব্যবহৃত গাড়ির অবস্থা একইরকম থাকে না, পুরোনো গাড়ির অবস্থা নির্ভর করে ব্যবহারের ইতিহাসের উপর। পুরনো গাড়ি কেনা অনেক বেশি কঠিন। কারণ গাড়ির অনেক বিষয় আপনার বিবেচনায় আনতে হবে গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে, যদি পরবর্তীতে পস্তাতে না চান। আজ পুরনো গাড়ি কেনার কিছু বিষয় নিয়ে যা বিবেচনায় রাখা উচিৎ বাংলাদেশে পুরোনো গাড়ি কেনার আগে কিংবা বলা যেতে পারে পুরো বিশ্বজুড়েই।

গাড়িতে আঘাত কিংবা মেরামতের চিহ্ন আছে কি?

যখন আপনি প্রথম বিক্রেতার সাথে দেখা করবেন গাড়িটি দেখার জন্য, সময় নিয়ে নিবিড়ভাবে নিরীক্ষণ করুন। গাড়ির বডিতে দুর্ঘটনার ফলে কোনো আঘাত কিংবা সারাইয়ের চিহ্ন থাকার কথা না যদি না বিক্রেতা পূর্বেই আপনাকে কোনো সতর্কতা দিয়ে থাকে গাড়ির ড্যামেজ সম্পর্কে।

আঘাতে চিহ্ন হয়তো বড় বিড়ম্বনার প্রতিবিম্ব; Image Source: rac.co.uk

আঘাতের ফলে সৃষ্ট গর্ত, দাগ পড়া, জং ধরা, কোনো পার্টস না থাকা অথবা ভাঙ্গা গ্লাস, এমন জরুরি যেকোনো কিছুই আপনার জন্য বিপদজনক। বাইরের অপরিপক্কতার দুটো কারণ হতে পারে, হতে পারে এটি গাড়ির বর্তমান মালিকের অবহেলার ফলাফল অথবা গাড়িটি কোনো দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। প্রথম কারণটি মেনে নেয়া গেলেও দ্বিতীয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। তাই প্রথমে তদন্ত করে দেখুন সহজে সমাধানযোগ্য কোনো সমস্যা কিনা, তা না হলে গাড়িটি না কেনাই শ্রেয়।

বাইরের পর্যবেক্ষণ শেষ হলে ভেতরটাতেও নজর দিন। গাড়ির সিট, মেঝে-ছাদের দাগ, নোংরা কিংবা বাজে গন্ধ আছে কিনা ভালো করে পরীক্ষা করুন। যদি আপনার মনে হয় বিক্রেতা আপনার আসার ঠিক আগেই গাড়িটির কোনো কিছু সাময়িক ভাবে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছেন এবং চেষ্টাটা যে অতি সম্প্রতি, তা যদি আপনার চোখে ধরা পড়েই যায়, তাহলে নিশ্চিত থাকতে পারেন বিক্রেতা আরো অনেক সমস্যাই আপনার কাছে লুকিয়ে যাচ্ছেন হয়তো।

অদক্ষ হাতের সারাই, নতুন রং করা এসব দেখে সহজেই বুঝে ফেলা উচিত বৃহৎ সমস্যা ভেতরে লুকোনো, এসব ক্ষেত্রে গাড়িটি না কিনে পাশ কাটানোই উত্তম।

গাড়িটি চলে বহুদূর, কতদূর?

গাড়িটি কোথা থেকে কিনছেন সেই উৎসটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ, এটা হতে পারে কোনো বন্ধুর, কোনো অনলাইন বিজ্ঞাপন দেখেও আগ্রহী হতে পারেন, কিংবা বিক্রেতা হতে পারে পুরনো গাড়ি বেচাকেনা করার কোনো তৃতীয় পক্ষের ব্যবসায়ী। সাধারণত যত্নের সাথে ব্যবহৃত একটি গাড়ি অনেক বেশি মাইল চললেও তা অযত্নে থাকা কম ব্যবহৃত গাড়ির থেকে ভাল সেবা দিয়ে থাকে। তাই গাড়ি কোন হাতে কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা জানাও জরুরি।

মাইলেজ দিতে পারে গাড়িটির অতীত ও ভবিষ্যতের ধারণা; Image Source: autocraditexpress.com

তারপরও মাইলেজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা বহন করে। সাধারণত ১,২০,০০০ মাইল পর্যন্ত চলা কোনো গাড়িকে বিবেচনা করা যেতে পারে, এর চেয়ে বেশি মাইল চলে থাকলে তা থেকে সরে আসাই ভাল। বরং আমরা পরামর্শ দেবো ৫০,০০০ মাইলের কম কিছু পেলে তা নিতে এবং এর থেকে বাড়লেও সর্বোচ্চ ৩০,০০০ মাইল উপরে যাবেন, তার বেশি কখনোই নয়। তবে আরেকটি ব্যাপার মাথায় রাখা উচিত, অডোমিটার ম্যানুয়ালি কাস্টোমাইজ করে নেওয়া যায়। তাই বিক্রেতা যদি সংখ্যাটি আগেই পরিবর্তন করে থাকেন, তাহলে এ থেকে গাড়ির সত্যিকারের অবস্থা জানা সম্ভব নয়।

বিক্রেতার বয়স কত?

আপনি যদি কারো ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে বিক্রেতার গতিপ্রকৃতির দিকে দৃষ্টি দিতে পারেন।

কম বয়সী কারো গাড়ি কেনা তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ; Image Source: express.co.uk

গাড়িটি যদি কমবয়সী কারো হয়ে থাকে, যেমন কিশোর- কিশোরী অথবা মধ্য পঁচিশ, সেক্ষেত্রে খুব সম্ভাবনা থাকে যে তারা গাড়িটি বেপরোয়া চালনায় অভ্যস্ত। তরুণ বয়সীরা গতির দিকে বেশি আগ্রহী থাকে। গাড়ি চালানোর সময় সঙ্গী যাত্রীর সাথে মজা করে, ফোনে কথা বলা কিংবা চ্যাট করে থাকেন অনেকে। খেতে খেতেও এক হাতে অনেকে গাড়ি চালাতে ভালোবাসেন। তাই ফলাফল হিসেবে গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। যদিও আপনার চোখে আপাতভাবে ধরা নাও পড়তে পারে। এসব দিক থেকে ভাবলে ত্রিশোর্ধ কারো গাড়ি কেনাটা তুলনামূলক নিরাপদ।

আপনি কি অধূমপায়ী?

আপনি যদি অধূমপায়ী হয়ে থাকেন, তাহলে গাড়িতে সিগারেটের গন্ধ একটি বিশাল সমস্যা বলা যায়। গাড়ির ফ্রেবিকস সিগারেটের দুর্গন্ধকে গাড়ির মালিক বদলানোর পরও বহু বছর পর্যন্ত ধরে রাখে।

গাড়িতে ধুমপানের গন্ধ দূর হয় না সহজে; Image Source: autogeek.net

বাস্তবিকপক্ষে, গাড়ির গন্ধে আপনার স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ধূমপায়ী কারো গাড়ি কেনা থেকে বিরত থাকাই ভালো। তবে আপনি যদি ধূমপায়ী হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে এটা আপনার জন্য তেমন কোনো সমস্যাই না, কিন্তু ধূমপান ছাড়ার পরামর্শ আপনার জন্য সবসময়ই থাকবে।

গাড়িটি কি স্পোর্টস কার?

সত্য বলতে, স্পোর্টস কার কেনার আসল উদ্দেশ্যই দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানো, এমনকি অনেক গাড়ি সংগ্রাহকরাও, যারা প্রায়ই গাড়ি কেনে গাড়িটির সক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য। আপনি যদি স্পোর্টস কার কেনার ব্যাপারে মনস্থির করে থাকেন, সতর্কতার সাথে গাড়ির অবস্থা লক্ষ্য করুন। সাধারণত এসব গাড়ির আসল মালিকরা গাড়িটির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ফেলেন বিক্রি করার আগেই।

গাড়িটি স্পোর্টস কার হলে প্রয়োজন আরো বেশি সচেতনতা; Image Source: motor1.com

তাই মিতসুবিশি লেন্সার ইভ্যালুয়েশন অথবা হোন্ডা এসটুথাউজেন্ডের মতো গাড়ি চমৎকার অবস্থায় পাওয়া খুবই বিরল ব্যাপার। আরেকটি ব্যাপার হলো, এসব গাড়ির ইন্সুরেন্স প্রচুর ব্যয়বহুল। তাই ইন্সুরেন্স আছে কিনা, সেটিও বিবেচ্য বিষয়।

ফ্লুইড লিক করছে?

গাড়ির ভেতরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার সময় যদি কোনোভাবে ফ্লুইড লিক হওয়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়, গাড়িটি কেনার চিন্তা সেখানেই বাদ দিয়ে দেয়া উচিত। ফ্লুইড লিক করা কখনোই ভালো বার্তা দেয় না৷

ফ্লুইড লিকের কোনো নিদর্শন চোখে পড়লে সেই গাড়ি না কেনাই ভালো; Image Source: carfromjapan.com

তেল, গ্যাস যাই হোক না কেন গাড়িটির জ্বালানী, তা মাটিতে পড়তে থাকলে তা যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদী খরচ হিসাব করেছেন?

পুরাতন গাড়ি কেনার সবচেয়ে বড় কারণই কিছুটা কমে পাওয়া, কিছু খরচ বাঁচানো। তবে এই বাঁচানো টাকা খুব বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখা যাবে না যদি গাড়িটি দুদিন পরপরই মেকানিকের কাছে পাঠাতে হয় একটা দুটা করে পার্টস বদলানোর জন্য।

সব হিসাব নিকেশ করেই কিনুন; Image Source: yourmechanic.com

তাই গাড়ির যন্ত্রাংশগুলো কোনটি কী অবস্থায় আছে, খারাপ অবস্থায় যেসব আছে, তা বদলে নিতে কী পরিমাণ খরচ হতে পারে কতদিন পরে, সেসব বিষয় নিয়ে একটু হিসাব-নিকাশ করেই মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিন, তাতে হয়তো ভবিষ্যতের অনেক বড় সমস্যায় পড়া থেকে আপনাকে রক্ষা করবে।

গ্যারান্টি ওয়ারেন্টি?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরোনো গাড়ির কোনো ওয়ারেন্টি থাকে না, বিশেষ করে আপনি যদি কোনো প্রাইভেট পার্টির কাছে থেকে গাড়ি কেনার চিন্তা করেন।

পুরোনো গাড়িতে ওয়ারেন্টি পেলে বাড়তি সুবিধা; Image Source: hpi.co.uk

তবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কিনলে কিছু ক্ষেত্রে ওয়ারেন্টি পাওয়া যায় – এমন পেশাদার কোনো এজেন্টের কাছে থেকে ওয়ারেন্টিসহ গাড়ি পেলে অবশ্যই সার্টিফাইড কারো কাছে থেকে নিন এবং আগেই খোঁজ নিন অন্য ক্রেতাদের কাছে থেকে তার বিক্রি পরবর্তী সেবা সম্পর্কে।

কেমন দামে পাচ্ছেন গাড়িটি?

দাম যেকোনো কিছু কেনার ব্যাপারেই অত্যন্ত বিবেচ্য বিষয়, বিশেষ করে গাড়ির মতো বড় খরচের ব্যাপারে তো বটেই।

দামদরে ছাড় নেই; Image Source: clickittefaq.com

বিক্রেতার দাম জানার পর তাই ভালভাবে যাচাই-বাছাই করুন, ক্রয় পরবর্তী খরচের হিসাবটাও মাথায় আনুন, সবকিছু মিলিয়ে ধীরে সুস্থে সিদ্ধান্ত নিন গাড়িটি সত্যিই আপনি এমন দামেই কিনতে চান কিনা। যদি মনে হয় বিক্রেতা বেশি দাম চাইছে, দামাদামি করে তা কমিয়ে আনার চেষ্টা করুন।

পুরোনো গাড়ি কেনা ভাগ্যের বিষয়

সবকিছুর পরও, পুরোনো গাড়ি কেনা সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। সবকিছু যাচাই করে এমনকি ভালো অবস্থায় পাওয়ার পরও আপনি নিশ্চিত হতে পারেন না, কেনার পর গাড়িটি সত্যিই ভালো সার্ভিস দেবে কিনা। তারপরও দেখে শুনে নিলে ঝুঁকি হয়তো কিছুটা কমে যায়, গাড়িটি পূর্ব মালিকের কাছে কতটা যত্নে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই ইতিহাস আপনাকে ধারণা নিতে সাহায্য করবে গাড়ির সম্পর্কে। যেহেতু আপনি অফিশিয়াল কোনো ডকুমেন্টস পাচ্ছেন না, তাই যতদূর সম্ভব যাচাই বাছাই করে নেয়াই উচিত।

পুরনো গাড়ি কেনা অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার, তবুও দেখে শুনে কেনার কোনো বিকল্প নেই; Image Source: oregonsportsnews.com

ক্রয়ের পূর্বে যত বেশি সম্ভব গভীরভাবে গাড়িটি পর্যবেক্ষণ করে নিন, যত বেশি সময় নিয়ে পারা যায়। ব্যবহৃত গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণের কোনো বিকল্প নেই কারণ হুটহাট দেখায় ভাল লাগা কিছু সত্যিই ভাল কিনা, তা পুরনো গাড়ির ব্যাপারে কোনো কিছু বলা নিতান্তই অসম্ভব। তাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে, বিক্রেতাকে প্রচুর প্রশ্ন করুন এবং তিনি সত্য বলছেন কিনা তা নিজেও যতদূর সম্ভব খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করুন।

আর এক্ষেত্রে এমন পরিচিত বিশ্বস্ত কাউকে সাথে নিন যিনি গাড়ি সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা রাখে, দু চোখের চেয়ে চার চোখ কিংবা এক মাথার চেয়ে দুটো মাথা খাটালে বেশি ভালো ফলাফল আশা করা যায়, তেমনি আপনার হাতে একটা সুযোগও বেশি বেঁচে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *