in ,

গরমে মোটরসাইকেল রাইডিং টিপস

ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে গ্রীষ্মকাল শেষ হয়ে বর্ষাকাল পড়লেও শেষ হয়নি তীব্র গরমের। হঠাৎ হঠাৎ দেশের কোথাও বৃষ্টি হলেও কমছে না গরমের দাবদাহ। আবহাওয়ার এমন অবস্থা অন্য সবার চেয়ে একটু বেশিই মাথাব্যথার কারণ হতে পারে রাইডারদের জন্য।

খোলা রাস্তায় মোটরসাইকেল চালানোর সময় না থাকে গাড়ির মত এসি, না থাকে রোদ থেকে মাথা বাঁচাতে কোন ছাদ। তাই গরমের সময়ে রাইডে হতে হবে বিশেষ সচেতন।

এমন কিছু বিশেষ সচেতনার ব্যাপার গুলো চলুন দেখে নেয়া যাক,

পানিশূন্যতা রোধ করুন

গরমে যে সবারই পানি ও তরল খাবার খেয়ে দেহের পানিশূন্যতা পূরণের চেষ্টা করতে হয়, সে কথা না বললেও চলে। তবে রাইডারদের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে আরো বেশি। গরমে রোদ মাথা, শরীরে পড়া তো আছেই, মোটরসাইকেল চলার সময় তীব্র বাতাসও শরীরের পানিশূন্যতা তৈরীতে অনেক বেশি ভূমিকা রাখে৷

পান করুন পর্যাপ্ত পানি এবং অন্যান্য তরল ; Image Source: youtube.com

তাই রাইডিং শুরু আগে যথেষ্ট পরিমাণ পানি তো খাবেনই, একটু লম্বা সময়ের রাইডিং হলে অবশ্যই স্যাডল ব্যাগে ওয়াটার বোটল এবং আইস প্যাক রাখুন। চাইলে হাইড্রেশন প্যাকও রাখতে পারেন।

কফি অথবা অ্যালকোহল জাতীয় তরল কিছু এড়িয়ে চলুন, কারণ এরা দেহে পানিশূন্যতা তৈরী করে আরো বেশি, যা আপনার সমস্যা বাড়াবেই কেবল।

নিয়মিত যাত্রা বিরতি ও মধ্যাহ্ন বিরতি

মোটরসাইকেল চলার সময় মেশিন হিসেবে গরমের তীব্রতা ক্রমবর্ধমান হতে থাকবে, মানে আপনি টানা যত বেশি সময়  মোটরসাইকেল চালাতে থাকবেন, তত বেশি গরম হবে বাইক, ঠান্ডা হতেও তত বেশি সময় লাগবে।

যাত্রায় নিতে হবে নিয়মিতভাবে বিরতি ; Image Source: japan.stripes.com

আর বাইকের তাপমাত্রা আপনার শরীরেও প্রবাহিত হবে, যা একইসাথে অস্বস্তিকর এবং ভীষণ ক্ষতিকরও৷

তাই আপনি যদি দীর্ঘ ভ্রমণে বের হন, তাহলে এমন ভাবে পরিকল্পনা করুন যাতে প্রতি ঘন্টার পন্চাশ মিনিট চলার পর দশ মিনিটের বিরতি দেয়া যায়।

এতে করে রাইডারের শরীর এবং বাইক দুটোই সুস্থ্য স্বাভাবিক থাকবে।

বিরতির সময়টুকুতে পানি এবং অন্যান্য তরল খাবার খেয়ে নিন, সম্ভব হলে মাঝে মাঝে স্যালাইনও।

আরো একটা কৌশল অবলম্বন করতে পারেন, প্রতিবার বিরতির সময় রুমাল বা এ জাতীয় কোন প্রমাণ সাইজের কাপড় ভিজিয়ে মাথায় রেখে তারপর হেলমেট পড়ুন, এতে রোদের তীব্রতা থেকে কিছুটা হলেও মাথাটা বাঁচবে।

তবে আপনার যদি অল্পতেই ঠান্ডা-সর্দির ধাঁচ থাকে, তাহলে এ কৌশল এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।

রাইডে বের হলে সব রাইডারই চায় প্রতিটা দিনেই পেছনে পড়ুক মাইলের পর মাইল রাস্তা, যত বেশি পারা যায়। তবে গ্রীষ্মকালীন গরমে একটু বিশেষ বিবেচনা করতেই হয়৷

দুপুর বারোটা থেকে বিকেল চারটা, এ সময়টা সূর্য থাকে সবচেয়ে তীব্র, অবস্থানও মাথার উপন। মানে হচ্ছে, এ সময় আরো বেশি গরম, আরো বেশি ডিহাইড্রেশন। তাই এই সময়টুকুতে যাত্রা বিরতি নিয়ে লান্চ এবং বিশ্রাম সেরে নেয়াই উত্তম।

তবুও নিরাপত্তা পোশাক

গ্রীষ্মের গরমে যেখানে কোনরকম পোশাকই গায়ে রাখা দারুণ কষ্টকর, সেখানে মোটরসাইকেল রাইডের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা পোশাক এবং অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার আরো বেশি কঠিন, তা আমরা জানি। তবুও আমাদের পরামর্শ থাকবে নিরাপত্তা পোশাক কোনভাবেই এড়িয়ে না যেতে৷

নিরাপত্তা পোশাকে করা যাবে না অবহেলা ; Image Source: gearpetrol.com

নিরাপত্তা পোশাক যে শুধুমাত্র আপনার নিরাপত্তাকে জোরদার করবে তা না, গরমে আপনার ত্বককে সরাসরি সূর্যের আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি থেকেও রক্ষা করবে।

অন্যদিকে শরীরে যত বেশি বাতাস লাগবে, তত দ্রুত শরীর পানিশুন্য হতে থাকবে। আর মোটরসাইকেল চালানোর সময় যেহেতু প্রচুর বাতাস লাগে তাই পোশাক কিছুটা হলেও পানি শূন্য হওয়া বিলম্বিত করে।

এসব গিয়ারের ক্ষেত্রে সামার সিজন বেসড যেসব পাওয়া যায়, তা সংগ্রহ করতে পারেন, বিশেষত গ্লাভস এবং এ্যাথলেটিক আন্ডারশার্ট যা আপনার ত্বকের ময়েশ্চারাইজারকে রক্ষা করবে এবং এয়ার সার্কুলেশনও বাড়াবে।

বৃষ্টি প্রস্তুতি

যেহেতু বাংলাদেশ ক্রান্তীয় জলবায়ুর দেশ, তাই গ্রীষ্মকালীন সময়ে গরমের সাথে প্রচুর বৃষ্টির সম্ভাবনাও থাকে আর এই মৌসুমী বৃষ্টিও আসে প্রায় হুট করে৷

বৃষ্টির জন্যও রাখুন প্রস্তুতি ; Image Source: dhgate.com

তাই মোটরসাইকেল গিয়ারে বৃষ্টি নিরোধক জ্যাকেট, প্যান্ট এবং সম্ভব হলে ব্যাগে একটা ফুল রেইনকোট রাখা দারুণ বৃদ্ধিমানের কাজ৷

এসব প্রস্তুতির সাথে হতে হবে সচেতনও রাইডের সময়, কারণ বৃষ্টি মানে রাস্তার কোথাও পানি এবং কাঁদা জমে যাওয়া, পিচ্ছিল কর্দমাক্ত রাস্তা মোটরসাইকেল আরোহীর জন্য বিশেষ বিপদজনক।

তাই বৃষ্টি এলে ড্রাইভিংটাও করতে হবে অতি সাবধানে।

উষ্ণ আবহাওয়ায় মোটরসাইকেল ব্যবস্থাপনা

আপনার বাইক যেভাবে কাজ করে অভ্যস্ত তার পুরোটাই আপনি আদায় করে নেন, তবে মেশিন হিসেবে গ্রীষ্মকালীন সময়ে অতিরিক্ত  মোটরসাইকেল এবং এর অন্যান্য যন্ত্রপাতির আরো কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে।

এসব জটিলতা এড়িয়ে যেতে কিছু পর্যায়ে বিশেষ সচেতনতা,

টায়ার প্রেসার

মোটরসাইকেল ম্যানুফ্যাকচারার যে পরিমাণ প্রেশার রাখতে পরামর্শ দিয়েছে টায়ারে, তা সচেতনভাবে নিশ্চিত করুন। রাইডিং এ কোন ভাবেই একেকসময় একেকরকম এয়ার প্রেসার টায়ারে নিয়ে রাইড করবেন না, এতে বিপদ হতে পারে, গরমে টায়ার থেকে বিপদ ঘটার সম্ভাবনা আরো বেশি।

ফ্লুইড, ফিল্টার এবং লুবরিক্যান্টস

একটি ইন্জিন ধারাবাহিক ভাবে পারফরম্যান্স করে যেতে পারে যখন ব্রেকডাউন এয়ারফ্লো স্বাভাবিক বা কিছুটা কম থাকে। গরমে যেহেতে আয়তন বেড়ে যায়, তাই এয়ারফ্লো স্বাভবিক থাকে না।

এজন্য গরমে রাইডে বের হওয়ার পূর্বে ফ্লুইডের লেভেল পরিপূর্ণ কিনা এবং এয়ার ফিল্টার পরিষ্কার কিনা তা বিশেষ ভাবে দেখে বেরুতে হবে।

গরমে অবসাদের লক্ষণ

সব প্রস্তুতি নেয়ার পরেও, যদি আপনি ডিহাইড্রেশন এড়িয়ে চলতে পারেন, শরীরে বাতাসের প্রবাহ বাড়াতে পারেন, তবুও আপনি অবসাদে পড়তে পারেন।

বিশেষত যখন আপনি বেশ লম্বা কোন রাইডে বেরিয়েছেন, যা সময় এবং দূরত্বের হিসেবে অনেক বেশি, আপনার জেনে রাখা উচিৎ অবসাদের ফলে সৃষ্ট লক্ষণগুলো,

*মাথাঘোরা

*পেশী খিল ধরা (

*প্রচুর ঘাম

*মানসিক ক্লান্তি বা শৈথিল্য

*সর্দি

*সংশয় কিংবা দিকভ্রান্তি

*অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন

অবসাদজনিত লক্ষ্মণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকুন ; Image Source: ridermagazine.com

লক্ষণগুলোর কোন একটি যদি নিজের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়, তখনই থামুন, ঠান্ডা কোন ছায়ায় বসুন, প্রচুর ঠান্ডা তরল খাবার খান। ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্রাম নিন যতক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিক হিসেবে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছেন।

এটি শুধু আপনার স্বাস্থ্যের জন্যই নয়, রাস্তায় আপনার এবং অন্যদের নিরাপত্তার জন্যও অনেক বেশি জরুরী।

আশা করা যায়, এসব পরামর্শ মেনে রাইডে বের হলে আপনার স্বাস্থ্যই ভালো থাকবে তা নয়, বরং আপনাকে নিরাপদও রাখবে রাস্তায়। গ্রীষ্মকালকেও তাই উপভোগ করুন এবং বেরিয়ে পড়ুন অ্যাডভেঞ্চারে।

শেষ করার আগে একটা ছোট অনুরোধ বরং করেই যাই, আপনারা যারা লং রাইডে যান, তারা ব্যাগে কিছু গাছের বীজ নিয়ে যেতে পারেন, রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় নিয়মিত বিরতিতে ছড়িয়ে গেলে অযত্নেই অনেক গাছ বেড়ে ওঠে,  যা ভবিষ্যতের কোন রাইডারকে দেবে ছায়া, বছর বছর উষ্ণতা বৃদ্ধিকে কিছুটা হলেও রোধ করবে। সবাই নিজের জায়গা থেকে ছোট ছোট এমন কিছু ভূমিকা রাখলেই হয়তো পৃথিবী বদলে দেয়া সম্ভব।

গাছ লাগান,  পৃথিবী বাঁচান।

যাত্রা হোক শুভ।







Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *