in ,

পুরাতন মোটরসাইকেলের মালিকানা পরিবর্তন!

আমাদের দেশের মানুষের মোটরসাইকেল কেনার হার দিনকে দিন কেবল বাড়ছেই। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল কিন্তু জনবহুল দেশে এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। মানুষের সামর্থ্য হচ্ছে ব্যক্তিগত যানবাহন কেনার, ব্যবহার করার। তবে অন্য সব জনবহুল দেশের মতো আমাদের দেশেও ট্রাফিক জ্যাম এক বিশাল সমস্যা। আর ঢাকার মত শহরের বাসিন্দা হলে জ্যাম তো প্রায় দুঃস্বপ্নের কাছাকাছি। 

জনবহুল দেশ, জ্যামের নগরী ঢাকায় চার চাকার গাড়ির চেয়ে মোটরসাইকেল বেশি সুবিধাজনক ; Image Source: youtube.com

তাই অটোমেশন ইন্ডাস্ট্রিতে ফোর হুইলারের চেয়ে বাইক যে বেশি চাহিদা সম্পন্ন বাজার সৃষ্টি করবে তা তো জানা কথাই।

মোটরসাইকেলের বাজার যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পুরনো মোটরসাইকেল কেনাবেচাও। পুরনো মোটরসাইকেল কেনা এবং বিক্রির অনেক রকম কারণ থাকতে পারে। বেশিরভাগ সময় কিছুটা সস্তা দামে পাওয়া যাবে বিবেচনা করে এই পথে পা বাড়ায়। আবার কখনো এমনো হয়, খুব পছন্দের কোন বাইক যা ইতিমধ্যে আর বাজারে নেই, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানেরও আর বাজারে নতুন করে আনার তেমন কোন চিন্তা নেই। অথচ আপনার ভীষণ পছন্দের মোটরসাইকেলটি আপনার চাইই চাই, এ ক্ষেত্রে পুরনো কেনা ছাড়া গতি কি, তবু যদি কেউ উৎসাহী হয়ে বিক্রি করতে আগ্রহী হয় তবে।

আমেরিকানদের পুরাতন গাড়ি ব্যবহারে বেশ ঝোঁক ; Image Source: 123rf.com

আবার আমাদের দেশে এই ট্রেন্ড কম হলেও, আমেরিকায় পুরনো গাড়ি ব্যবহারের একটা ট্রেন্ড আছেই ভালোরকম। যত পুরনো মডেলের গাড়ি, তত ক্লাসি ব্যাপার। এমন অনেক রেকর্ড আছে, একটা গাড়ি গত শতাব্দীর ষাটের দশকে লন্চ করে যত প্রফিট করতে সমর্থ হয়েছিল, ২০১৪ সালে তারা পুরনো মডেলের কিছু লিমিটেড এডিশন এনে প্রফিট করে নেয় প্রায় শতগুণ।

তাহলে দেখতেই পাচ্ছি, পুরনো গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল কেনা বেচাটা বিরল কোন ব্যাপার নয়, অহরহই ঘটে আসছে সারা পৃথিবীতেই।

তবে পুরনো মোটরসাইকেল কেনার আগে যেসব বিষয় দেখে নিতে হবে, তাদের মধ্যে প্রথম হচ্ছে বৈধ কাগজ পত্র। সাথে জানতে হবে মোটরসাইকেলের মালিকানা পরিবর্তন করার নিয়ম কানুন সম্পূর্ণভাবে।

কেন প্রয়োজন

মালিকানা পরিবর্তন প্রয়োজন কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি বৈধভাবে কাগজে কলমে মালিকানা পরিবর্তন করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত টাকা দিয়ে মোটরসাইকেল কিনেও তার প্রকৃত মালিক আপনি কিনা, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। তাই পুলিশি হয়রানি মামলা মোকদ্দমা এড়াতে চাইলে রাস্তাঘাটে, কাগজপত্র রেডি করে হবে।

আর দুর্ভাগ্যজনক ভাবে যদি মোটরসাইকেলটি চুরি হয়ে যায়, বৈধ কাগজ পত্র ছাড়া আপনি থানায় গিয়ে সামান্য জিডিও  করতে পারবেন না। তাই যার কাছে থেকে, যেভাবেই হোক, কেনার সময়ই মোটরসাইকেল রেজিষ্ট্রেশন করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন।

বিআরটিএ অফিসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ফরম জমা দিতে হবে ; Image Source: daily-sun.com

বিআরটিএ’র ওয়েবসাইটে বর্ণিত নিয়মে মোটরসাইকেলের মালিকানা পরিবর্তন ব্যাপারটি মোটেও জটিল এবং সময়সাপেক্ষ নয় বরং সঠিক কাগজ পত্র সহ দাখিল করলে খুব সহজেই পুরনো মোটরসাইকেল কিনেও বৈধ কাগজপত্র সমেত রাস্তায় চলতে ফিরতে পারা যায়।

নীচে আমরা মোটরসাইকেলের মালিকানা পরিবর্তন সংক্রান্ত  বিআরটিএ’র নিয়ম কানুন এবং সম্পূর্ণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো,

মোটরসাইকেলের মালিকানা পরিবর্তন করতে খরচ

প্রথমেই খরচের কথাটা বলে নেয়া যাক, খরচ মূলত কত সিসি ইন্জিনের মোটরসাইকেল কিনছেন, তার ওপর নির্ভর করে,

নম্বর প্লেট ছাড়া,
মোটরসাইকেল ১০০-১৫০ সিসির জন্য ব্যাংকে জমা দেয়া লাগে,

মালিকানা ফি –                      ২,৬৬৫/- টাকা

ডিজিটাল ব্লু বুক –                    ৫৫৫/- টাকা

প্রতিলিপি ফি –                            ৩৪৫/- টাকা

নম্বর প্লেট ছাড়া,
০০-১০০  সিসির মোটরসাইকেলের জন্য ব্যাংকে জমা দেয়া লাগে,

মালিকানা ফি –                      ২,১২৮/- টাকা

ডিজিটাল ব্লু বুক –                    ৫৫৫/- টাকা

প্রতিলিপি ফি –                            ৩৪৫/- টাকা

আবার, নম্বর প্লেট সহ,
১০০-১৫০ সিসির মোটরসাইকেলের জন্য ব্যাংকে টাকা জমা লাগে,

মালিকানা ফি –                    ২,৬৬৫/- টাকা

ডিজিটাল নাম্বার প্লেট –       ২,২৬০/- টাকা

ডিজিটাল ব্লু বুক –                    ৫৫৫/- টাকা

প্রতিলিপি ফি –                            ৩৪৫/- টাকা

নাম্বার প্লেটসহ,
০০-১০০ সিসির মোটরসাইকেলের জন্য ব্যাংকে জমা দেয়া লাগে

মালিকানা ফি –                    ২,১২৮/- টাকা

ডিজিটাল নাম্বার প্লেট –       ২,২৬০/- টাকা

ডিজিটাল ব্লু বুক –                    ৫৫৫/- টাকা

প্রতিলিপি ফি –                            ৩৪৫/- টাকা

মোটরসাইকেল মালিকানা বদলির ফর্ম

রেজিষ্ট্রেশন নাম্বারঃ
মালিকের নামঃ
পিতার নামঃ
ঠিকানাঃ

মালিকানা বদলীর প্রয়োজনীয় কাগজ পত্রাদি

০১) টি ও ফরম
০২) টি টি ও ফরম
০৩) এইচ ফরম
০৪) বিক্রয় রশিদ
০৫) ১০ টাকার রেভিনিউ স্ট্যাম্প
০৬) ক্রেতা+বিক্রেতার ছবি (৩+২ স্বাক্ষরযুক্ত)
০৭) ক্রেতার ন্যাশনাল আইডির ফটোকপি
০৮) বিক্রেতার ন্যাশনাল আইডির ফটোকপি
০৯) ক্রেতার TIN নম্বরের ফটোকপি
১০) বিক্রেতার TIN নম্বরের ফটোকপি
১১) TAX টোকেন এর আপডেট ফটোকপি
১২) ফিটনেস এর আপডেট ফটোকপি
১৩) ২০০টাকার ক্রেতার স্ট্যাম্প
১৪) ২০০টাকার বিক্রেতার স্ট্যাম্প
১৫) মালিকানা বদলীর ফি বাবদ (ব্যাংক জমা রশিদ)
১৬) গাড়ী পরিদর্শন
১৭) বিক্রেতা হাজির
১৮) ক্রেতা হাজির

মালিকানা বদলীর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত মালিকানা ব্যতিত):

ক্রেতার করণীয়ঃ

১। পূরণকৃত ও স্বাক্ষরিত ‘টিও’ ও ‘টিটিও’ ফরম। (বিআরটিএ’ র ওয়েবসাইটে দুটি ফরমই পাওয়া যাবে।

২। প্রয়োজনীয় ফি জমা দানের রশিদ ।

৩। ক্রেতার TIN সার্টিফিকেটের সত্যায়িত কপি (ভাড়ায় চলে না এমন কার, জিপ, মাইক্রোবাস-এর ক্ষেত্রে) ।

৪। মূল রেজিস্ট্রেশন সনদ (উভয় কপি)/ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট(প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) ।

৫। ছবিসহ নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে ওয়ারিশগণের হলফনামা (একাধিক ওয়ারিশ থাকলে এবং একজনের নামে মালিকানা প্রদান করা হলে অন্যান্য ওয়ারিশগণ কর্তৃক স্ট্যাম্পে আর একটি হলফনামা দিতে হবে)।

ধাপগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে হবে ; Image Source: wallpapercave.com

৬। সংশ্লিষ্ট নমুনা স্বাক্ষর ফরমে ক্রেতার নমুনা স্বাক্ষর এবং ইংরেজীতে নাম, পিতার/স্বামীর নাম, পূর্ন ঠিকানা ও ৩ কপি স্ট্যাম্প আকারের রঙ্গীন ফটোসহ ফরমের অন্যান্য সকল তথ্য প্রদান, তবে ক্রেতা কোন প্রতিষ্ঠান হলে, উপরে বর্ণিত কাগজপত্রসহ (হলফনামা ব্যতিত) অফিসিয়াল প্যাডে চিঠি।

বিক্রেতার করণীয়ঃ

১। ফরম ‘টিটিও’ এবং বিক্রয় রশিদে স্বাক্ষর ।

২। বিক্রেতার ছবিসহ বিক্রয় হলফনামা ।

৩। বিক্রেতা কোম্পানী হলে কোম্পানীর লেটার হেড প্যাডে ইন্টিমেশন, বোর্ড রেজিুলেশন ও অথরাইজেশন পত্র প্রদান ।

৪। মোটরযানটি ব্যাংক অথবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের নিকট দায়বদ্ধ থাকলে দায়বদ্ধকারী প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোদ সংক্রান্ত ছাড়পত্র সংগ্রহ করে তা দাখিল করা ।

ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত মোটরসাইকেলের মালিকানা বদলীর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

১। পূরণকৃত ও স্বাক্ষরিত ‘টিও’ ও ‘টিটিও’ ফরম (এ দু’টি ফরমসহ অন্যান্য ফরম বিআরটিএ’র ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।)

২। কোর্ট/স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত ওয়ারিশ সংক্রান্ত সনদ।

৩। প্রয়োজনীয় ফি জমা দানের রশিদ।

৪। একাধিক ওয়ারিশ থাকলে প্রথম ওয়ারিশের TIN সার্টিফিকেটের সত্যায়িত কপি (ভাড়ায় চলে না এমন কার, জিপ, মাইক্রোবাস-এর ক্ষেত্রে)।

৫। মূল রেজিস্ট্রেশন সনদ (উভয় কপি)/ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট(প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।

৬। ছবিসহ নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে ওয়ারিশসূত্রে মালিকানা প্রাপ্তি সংক্রান্ত ওয়ারিশগণের হলফনামা (একাধিক ওয়ারিশ থাকলে এবং একজনের নামে মালিকানা প্রদান করা হলে সেক্ষেত্রে অন্যান্য ওয়ারিশগণ কর্তৃক সকলের ছবিসহ নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে আরও একটি হলফনামা) ।

৭। নমুনা স্বাক্ষর ফর্মে নমুনা স্বাক্ষর এবং ইংরেজীতে নাম, পিতার/স্বামীর নাম, পূর্ন র্ঠিকানা ও ৩ কপি স্ট্যাম্প আকারের রঙ্গীন ছবি সহ ফরমের অন্যান্য তথ্য পূরণ।

ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত মোটরসাইকেলের মালিকানা পরিবর্তন কিছুটা ভিন্ন ; Image Source: reddit.com

আশা করা যায়, উপরের নিয়ম কানুনগুলো ভালো করে কয়েকবার দেখলে সহজেই মোটরসাইকেলের মালিকানা পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রশাসনিক কাজকর্ম নিজেই সামলে নিতে পারবেন।

এভাবেই চাইলে নিজে নিজেই করে নিতে পারবেন নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্স, নতুন মোটরসাইকেল কিনলেও তার রেজিষ্ট্রেশনও করে নিন নিজেই দালালের ঝক্কি ঝামেলা ছাড়াই।

তবে পুরনো গাড়িই কিনুন কিংবা পুরনো মোটরসাইকেল, আগে দেখে শুনে তারপর সিদ্ধান্ত নিন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *