in , ,

মোটরসাইকেল রাইডে প্রয়োজনীয় এক্সেসরিজ

মোটরসাইকেল এমন এক যানবাহন যা নিয়ে প্রায় সব জায়গায় ভ্রমণের উপযোগী। একা কিংবা দুজনের জন্য মোটরসাইকেলের চেয়ে শ্রেয় আর কোন যান হতে পারে না। গাড়ির মত যেমন অধিক জ্বালানী চাহিদা নেই মোটরসাইকেলের, তেমনি পাহাড়, বন কিংবা দূর্গম এলাকায় যেখানে গাড়ি নিয়ে যাওয়া সম্ভবও নয়, মোটরসাইকেলের বিকল্প আর কি বা হতে পারে!

শহর এলাকাতেও সরু গলিতে গাড়ি নিয়ে ঢোকা বিশেষত গাড়ি ঘোরানো এবং পার্ক করা যেখানে বিশাল ঝক্কি-ঝামেলার কাজ, মোটরসাইকেলে অনায়াসেই ঘুরে আসা যায় সেসব এলাকা। এমনকি ব্যস্ত রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামকে ফাঁকি দিতেও মোটরসাইকেলের চেয়ে ভাল উপায় আর পাওয়া যাবে না।

প্রতীকী দিক থেকে বিবেচনা করলেও মোটরসাইকেলের চেয়ে বেশি উদ্দাম তারুণ্য আর স্বাধীনতা আর কোন যানবাহনেই বা আছে।

তবে মোটরসাইকেলের নেতিবাচক দিক যদি ধরতে বসি, প্রথমেই যা আসে তা হচ্ছে, অনিরাপদ যান। দূর্ঘটনাপ্রবণ যান হিসেবে মোটরসাইকেলের কুখ্যাতির তুলনা মেলা ভার।

তবে একটু সাবধানতা অবলম্বন করে এসব দূর্ঘটনার চাইলেই এড়ানো সম্ভব। তারপরও দূর্ঘটনা যেহেতু বলে আসে না, তাই মোটরসাইকেল রাইডিং এ প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক কিছু উপকরণের ব্যবহার দূর্ঘটনার প্রবণতা যেমন কমায়, তেমনি কমায় ক্ষতির সম্ভাবনাও৷

মোটরসাইকেলের প্রয়োজনীয় কিছু এক্সেসরিজ নিয়েই সাজানো আজকের লেখাটি, 

এ্যারোডায়নামিক হেলমেট (Aerodynamic Helmet)

একজন রাইডারের প্রাথমিক সুরক্ষার কথা ভাবলে লিস্টের প্রথমে হেলমেট ছাড়া অন্য কোন বিকল্প হতেই পারে না।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই রাইডারদের হেলমেট ব্যবহার আইনত  বাধ্যতামূলক। একটা সময় অবশ্য রাইডাররা হেলমেট ছাড়া মোটরবাইক চালানোকে হিরোইজম, স্মার্টনেসের অংশ মনে করতো।

তবে এখন এতো চমৎকার ডিজাইন এবং আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন হেলমেট বাজারে পাওয়া যাচ্ছে যে, হেলমেটই হয়ে উঠেছে রাইডারদের স্মার্টনেসের একটা অংশ।

এ্যারোডায়নামিক হেলমেট ; Image Source: aliexpress.com

এ্যারোডায়নামিক ডিজাইনের হেলমেটের জন্য যে কোন রাইডারই খরচ করতে রাজি থাকবে, এই ডিজাইনের হেলমেট গুলো বাইককে সুঁই সমতুল্য সঠিক ট্র্যাকে রাখতে সাহায্য করে, দ্রুত গতিতে চলার সময় কানে খুব কম নয়েজ হয়।

তবে আরেকটা পরামর্শ এখানে অবশ্য উল্লেখ্য, মজবুত, আঘাত সহ্য করতে পারবে, এসব বিবেচনার সাথে সাথে হালকা ওজনের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে হেলমেট কেনার ক্ষেত্রে, এতে দীর্ঘ রাইডিং এ আপনার ঘাড়, মাথা ব্যথা হওয়া সম্ভাবনা কমবে।

অর্থনৈতিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন, ভালো হেলমেটের জন্য হয়তো কিছুটা বেশি খরচ করতে হবে, তবে দীর্ঘ রাইডিং এ নিরাপত্তা এবং উপভোগের কথা ভেবে কিছুটা বেশি খরচ করে ভালো জিনিস নেয়া যেতেই পারে৷

আরমার্ড লেদার জ্যাকেট (Armoured Leather Jacket)

মোটরসাইকেল চালানোর জন্য বেশিরভাগই সাধারণ লেদার জ্যাকেট ব্যবহার করে যা মূলত তেমন কোন সুবিধা দেয় না শার্ট – টিশার্ট পরে চালানোর চেয়ে। মোটরসাইকেল চালানোর সময় বিশেষত দীর্ঘ রাইড কিংবা ব্যস্ত রাস্তায় রাইড করলে অবশ্যই রাইডিং এর জন্য বিশেষ ডিজাইনে তৈরী ভালো মানের লেদার জ্যাকেট ব্যবহার করা উচিৎ।

আরমার্ড লেদার জ্যাকেট ; Image Source: lathersoutwest.com

আর আরমার্ড ফিচার নিয়ে খোলামেলা বললে, এটা রাইডিং এ ঝুঁকি কমায় এক্সিডেন্টে ক্ষতির। এক্সিডেন্ট যেহেতু বলে আসে না আর বাইকের ক্ষেত্রে এর মাত্রা একটু বেশিই, তাই একটু সাবধানতা অবলম্বন করলে ক্ষতি কী!

আরমার্ড জ্যাকেটে কনুই, ঘাড়ের কাছে অতিরিক্ত প্রটেকশন দেয়া থাকে। যেহেতু পড়ে গেলে এসব জায়গায়ই বেশি আঘাত প্রাপ্ত হয়, আরমার্ড লেদার জ্যাকেট ক্ষতিহ্রাসে ভালোই ভূমিকা রাখে।

আপনার রাইডিং এর এলাকার উপর ভিত্তি করে জ্যাকেট ওয়াটাপ্রুভ হবে নাকি বডি ওয়ার্মার হবে তা নির্ধারণ করতে হবে।

গ্লাভস (Gloves)

আমেরিকান হাসপাতালগুলোর ইমার্জেন্সি বিভাগে চালানো এক জরিপে দেখা যায়, আহত হাত নিয়ে আসা রোগীদের ৭০ শতাংশের আহত হওয়ার কারণ, গ্লাভস ব্যবহার না করা।

অস্ট্রেলিয়ায় সংখ্যাটা আরো বেশি, প্রায় ৯৩ শতাংশ।

তাহলে কল্পনা করতেই পারছেন, আমাদের দেশের সঠিক পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও  সংখ্যাটা কত বড় এবং ভয়াবহ।

পড়ে যাওয়ার সময় মস্তিস্ক এমন ভাবেই কাজ করে যে, না চাইলেও শরীরের অন্য যে কোন অঙ্গ বাঁচাতে হাত চলে আসে সামনে, তাই ক্ষতিগ্রস্তও হয় বেশি।

এছাড়াও মোটরসাইকেল চালনায় হাতের যেহেতু সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার, তাই নিজস্ব অসুবিধা যেমন, হাত ঘেমে যাওয়া, ফসকে যাওয়া ইত্যাদি এড়িয়ে যেতে গ্লাভসের বিকল্প নেই।

রাইডিং গ্লাভস ; Image Source: amazon.com

প্লাস্টিক বা র্যাক্সিনের গ্লাভস বেশ সস্তায় পাওয়া গেলেও আমাদের পরামর্শ সবসময়ই লেদার গ্লাভসের পক্ষে, এটি যেমন টিকবে বেশিদিন, তেমনি আপনার হাতকে তুলনামূলক বেশি নিরাপদও রাখবে।

হেলমেট, গ্লাভস, জ্যাকেট, এবার ভেবে দেখুন তো সাধারণ অবস্থার থেকে কত বেশি নিরাপদ আপনার শরীরের উপরিভাগ, শুধু তিনটা এক্সেসরিজ ব্যবহারের ফলেই।

ইয়ারপ্লাগস (Earplugs)

শরীরের উপরিভাগের অধিকাংশেরই সুরক্ষার ব্যবস্থা উপরে বলা হলেও ইয়ারপ্লাগ হতে পারে আরো একটি চমৎকার গিয়ার। হেলমেট কান ঢেকে কানের সুরক্ষা করলেও দ্রুত গতিতে বাইক চালানোর সময় বাতাসের শব্দ রাইডারের জন্য বিরক্তিকর এবং কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণও।

ইয়ারপ্লাগস ; Image Source: blog.jafrum.com

ইয়ারপ্লাগের ব্যবহার এসব শব্দ থেকে আপনার শ্রবণ ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করে আপনাকে প্রাণবন্ত থাকতে সাহায্য করবে।

রাইডিং প্যান্ট (Riding Pants)

দূর্ঘটনাবশত ৬০ কিলোমিটার গতিতে পড়ে গেলেও দুটো জিন্স প্যান্ট ছিড়ে হাঁটু পা ছিঁলে ফেলা প্রভুত সম্ভাবনা থেকে যায়। বেশিরভাগ রাইডার, যারা লং রাইডে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তারা পায়ে বেশ কয়েকটি আরমার্ড ব্যবহার করেন, যেমন নি গার্ড(knee guard)।

রাইডিং প্যান্ট ; Image Source: sedici.com

তবে কেভলার লাইনিং এর মত কিছু গার্মেন্টস কোম্পানি এখন বাইকারদের জন্য বিশেষ ডিজাইনের আরমার্ড সমৃদ্ধ প্যান্ট তৈরী করছে।

তাদের দাম কিছুটা বেশি হলেও, বেশি নিরাপদ বলা যায়। এছাড়াও আপনি কর্ডুরা গার্মেন্টসেও নজর বোলাতে পারেন। তবে নিরাপত্তা, আরামদায়কতার উপর বিবেচনা করে সেরা জিনিসটাই বেছে নেয়া উচিৎ, দাম একটু বেশি হলেও।

টাফ বুট ( Tough Boots)

হাতের কথা বাদ দিলে, মোটরসাইকেল রাইডিং এ পা-পায়ের পাতা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে৷ সেই ঝুঁকি কমাতে রাইডিং বুট ব্যবহার খুবই প্রয়োজনীয়।

রাইডিং বুট ; Image Source: gearpetrol.com

এবং রাইডিং বুটে আপনার স্টাইল নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে উদ্বিগ্ন হওয়ারও কিছু নেই কারণ দারুণ সব স্টাইলিশ রাইডিং বুট এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।

পায়ের আঙুল, পায়ের পাতা থেকে শুরু করে পায়ের ছোট হাড় পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে সক্ষম ভালো মানের রাইডিং বুট। আঁটোসাটো  হয়ে চেপে ধরা নয়, পায়ের সঙ্গে মানানসই, আরামদায়ক এসব কিছু বিবেচনা করার সাথে সাথে নিরাপত্তার ব্যাপারটাও বিবেচনায় রাখতে ভুলবেন না।

টুল কিট ( Tool Kit)

রেন্চ, সকেট, স্ক্রু ড্রাইভার, প্লাসের মত ছোট, সাধারণ কিন্তু কার্যকরী যন্ত্রপাতিসমেত মাল্টিটুলের একটা ব্যাগ সবসময় সাথে রাখুন। তার সাথে কিছু ক্যাবলও বেঁধে নিতে পারেন।

মাল্টি টুল কিট ; Image Source: bokesrepublic.com

এছাড়া মাল্টি পারপাস টুল এবং মাইক্রো ফাইবারের একটা টাওয়েলও সাথে রাখা যেতে পারে মোছার জন্য।

তালিকাটা মূলত আবশ্যকীয় এক্সেসরিজগুলো নিয়ে, এর বাইরেও আরো অনেক কিছু রয়ে গেছে যা মোটরসাইকেল রাইডিং এ ব্যবহার করা যেতে পারে।

সত্যি বলতে, এক্সেসরিজ শপগুলোতে ঢুকলে আপনার মাথা খারাপ হয়ে যাবে এতো জিনিস দেখে,যার বেশির ভাগই যতটা না প্রয়োজনীয়, তার  অনেক বেশি বিলাসবহুল।

তবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকেই, কোনটা ব্যবহার করতে চান আর কোনটা এড়িয়ে যেতে চান। আর এক্সেসরিজের দাম যেহেতু বেশ চড়া, তাই বাজেটের দিকেও নজর রাখতে হবে।

তবে উপরের তালিকায় থাকা এক্সেসরিজের ব্যপারে সবচেয়ে ভালোটাই বিবেচনায় আনতে পরামর্শ থাকবে, দামের জন্য সস্তা কম ভালো কোন কিছু কিনে ঝুঁকিতে থাকবেন না।

হ্যাপি & সেফ রাইডিং! 
   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *