in , ,

মোটরসাইকেলের ইন্জিন টিউনিং টিউটোরিয়াল

ইন্জিন সংক্রান্ত বিষয়ে যখনই ‘টিউনিং’ শব্দটি আসে, আমরা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি আসলে ব্যাপারটা কী হবে, কেমন হবে তা ভেবে। ব্যক্তিগতভাবে ডিকশনারিতে থাকা টিউনিং এর একটা অর্থ আমার খুবই পছন্দ, ‘ছন্দময় করা’!

যদিও টিউনিং বিভিন্ন ধরণেরই হতে পারে,

*ইন্জিন টিউনিং

*টিউন আপ

*রেস/পারফরম্যান্স টিউনিং

*স্টেজ টিউনিং

*ফুললি টিউনড 

টিউনিং কী?

বেশিরভাগ মানুষের ধারণা, মোটরসাইকেল ইন্জিন টেকনোলজিতে  সাধারণত দুই ধরণের টিউনিং এর স্বতন্ত্র আবেদন রয়েছে।

প্রথমটা যেভাবে স্টক মেশিন কাজ করে অথবা স্টক মেশিনের টিউনে টিউন করে নেয়া এবং দ্বিতীয়টি যেখানে ইন্জিনকে চরমভাবে পরিবর্তিত করা হয় গতি বাড়াতে প্রতিযোগিতায়, যাকে বলা হয় রেস/পারফরম্যান্স টিউনিং।

সবার আগে জেনে রাখা ভালো ফোর স্ট্রোক ইন্জিন কিভাবে কাজ করে

ফোর স্ট্রোক ইন্জিন যেভাবে কাজ করে ; Image Source: bikesrepublic.com

উপরের ইলাস্ট্রেশনটি আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে ফোর স্ট্রোক ইন্জিনের কার্যক্রমের পর্যায়গুলো। এ থেকেই আপনি বুঝতে পারবেন আপনার মোটরসাইকেলটি মোডিফাই কিংবা টিউনিং এর পর কী ধরণের প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।

কেন টিউন করবেন?

টিউনের অর্থই হলো ইন্জিনের কার্যদক্ষতার আয়তন বাড়িয়ে নেয়া। অন্য কথায় বলা যায়, টিউনের পর ইন্জিন অধিক শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা রাখে আগের অবস্থায় থেকেই৷

ঠিকঠাক টিউন মোটরসাইকেলের ভালো রকমের পারফরম্যান্স বৃদ্ধি করে ; Image Source: bhpmoto.com

উদাহরণ স্বরুপ, একটি ১০০০ সিসি’র ইন্জিন হয়তো স্টক অবস্থায় ১২৫ হর্স পাওয়ার কর্মক্ষমতায় থাকে এবং রেস টিউনিং করলে সেই কর্মক্ষমতা গিয়ে দাড়ায় ১৭৫ হর্স পাওয়ারে।

এটা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যে কোন একটা আইটেমের টিউনিং মোটরসাইকেলের পরিপূর্ণ পারফরম্যান্স বাড়াতে পারে না। তবে পারফরম্যান্স বাড়বে যদি পরিবর্তনগুলো ইন্জিনের কার্যক্রমকে কাঙ্ক্ষিত ছন্দে নিয়ে আসে৷

তবে খোলা বাজারের পার্টস বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই টিউনিং এ ভালো প্রভাব ফেলতে পারে না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দশটি পার্টস আইটেম পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিটিতে ১০ এইচপি করে ক্ষমতা বাড়ালেও তারা ছন্দময় ভাবে না কাজ করতে পারলে আপনি সর্বমোট ১০০ এইচপির বর্ধিত পারফরম্যান্স পাবেন না।

সিলিন্ডার হেড (Cylinder Head)

সিলিন্ডার হেড সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন করা হয় মোটরসাইকেল ইন্জিন টিউনিং এর ক্ষেত্রে। এটি মূলত গ্যাস ফ্লো নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আপনি যখন বড় আকৃতির ভালভ ব্যবহার করবেন, তার সাথে ফিট করে গ্যাস ফ্লো ঠিক রাখার জন্য সিলিন্ডার হেড ফেসও বাড়াতে হবে। আর এ সব পরিবর্তনের অর্থ, সিলিন্ডারের গ্যাস ফ্লোতে উন্নতি করা।

সিলিন্ডার হেড টিউন ; Image Source: youtube.com

ফুয়েল এয়ার মিক্সচার কার্বুরেটর থেকে ইন্টেল মেইনফোল্ডের ভেতর দিয়ে পপেট ভালভের মাধ্যমে সিলিন্ডার হেডে পৌছায়।

ফুয়েলের গতি নির্দেশ দেয়া থাকে কমবাস্টনের ভেতর দিয়ে এবং তা নির্ভর করে পিস্টনের আকৃতি এবং সিলিন্ডার হেডের ভেতরকার আকৃতির উপর। সিলিন্ডার হেড হচ্ছে সবচেয়ে উপরের কমবাস্টন চেম্বার, পিস্টনের শেষপ্রান্ত।

সিলিন্ডার হেডকে মোডিফাই করার প্রক্রিয়াকে সাধারণত পোর্টিং বলা হয়৷

মূলত পোর্টিং কমবাস্টন চেম্বারে ফুয়েল/এয়ার ঢুকে মেশার ক্ষেত্র বাড়ায়, আর যত বেশি ফুয়েল আসবে তত বেশি যে শক্তি উৎপাদন হবে সে তো জানা কথাই৷

তাই টিউনিং এর সময় মাইলিং মেশিন দিয়ে মেপে সর্বোচ্চ উপযোগিতা বের করে নিতে হবে ঠিক কতটুকু ফুয়েল পেলে ইন্জিন সর্বোচ্চ দক্ষতায় কাজ করবে কিন্তু ফুয়েল নষ্টও হবে না।

অনেক ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলের মাইলেজ বাড়াতে ফুয়েল আসার রাস্তা কমিয়েও টিউন করা হয়।

ক্যামশ্যাফটস (Camshafts)

নিঃসন্দেহে ইন্জিনে ক্যামশ্যাফটের যে লোকেশন, তাতে ক্যামশ্যাফটকে পরিবর্তিত কিংবা স্থানান্তর করতেই হয় ইন্জিন টিউনের ক্ষেত্রে।

ভালভ এবং ক্যামশ্যাফট ; Image Source: 123rf.com

সাধারণত ভালো মানের ক্যামশ্যাফট ভালভকে দ্রুত খুলতে পারে এবং বেশিক্ষণ খোলা রাখে।

ক্যামশ্যাফটের আকৃতি চাইলে পরিবর্তন করা যায় তবে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভালভের কিংবা পরিবর্তিত ভালভের লিফট, ওপেনিং ডিউরেশন ইত্যাদির সাথে ভালভাবে পরিমাপ করে ক্যামশ্যাফট লাগানো উচিৎ।

এ ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন কারণ ঠিকভাবে ঠিক আকৃতির সমন্বয় না হলে ইন্জিনের বড় ধরণের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে৷

আপগ্রেডেবিলিটিঃ সিলিন্ডার, পিস্টন, ক্র্যাংকস, রডস  (Upgradeability: Cylinders, Pistons, Cranks, Rods)

যেহেতু টিউনিং করে পাওয়ারের আউটপুট বাড়ানো হয়, সেহেতু তার ধারণক্ষমতা অনুযায়ী পার্টসের বদলেরও প্রয়োজন পড়ে। তাই কিছু পার্টস এমন লাগানো প্রয়োজন হয় যারা বড় ধরণের স্ট্রেস নিতে সক্ষম।

হালকা পিস্টন বদলে শক্তিশালী পিস্টন লাগিয়ে ইন্জিন টিউনিং করতে হয়, যেহেতু ইন্জিন শক্তিশালী হয়ে উঠলে তা বেশি গরম হয় এবং ধকলও বেশি যায়৷

টিউনিং এ উচ্চ আরপিএম পেয়ে গেলে এদের সংযোগকারী রডস পরিবর্তনের মাধ্যমে ভালো এবং বিলেট স্টিল রডস ব্যবহার করতে হয় যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এলুমিনিয়াম অথবা টিটানিয়ামের তৈরী৷

খুব উচ্চমাত্রার টিউনিং হলে, ক্র্যাংকশ্যাফট স্থানান্তর অথবা পরিবর্তন করতেই হবে। এক পিসের স্টক ক্র্যাংক সাধারণত টিউনিং এর সাথে সমন্বিতই থাকে, তবে হাইলি-মোডিফিকেশনের জন্য ওয়েল্ডিং থেকে শুরু করে ক্র্যাংক পিন পর্যন্ত স্থানান্তর করার প্রয়োজন হয়।

অক্সিলারিস (Auxiliaries)

টিউনড ইন্জিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম হবে, তাই কুলিং সিস্টেমের উন্নয়ন করতেই হবে।

ইন্জিন ওয়েল কুলার ; Image Source: motorcyclistonline.com

বেশিরভাগ টিউনার ইন্জিন ওয়েল কুলার টিউনিং এরেন্জমেন্টে রাখতে অবহেলা করে।  ফলশ্রুতিতে অতিরিক্ত গরম হয়ে ইন্জিন আশানুরূপ পারফরম্যান্স দিতে ব্যর্থ হয়।

ইসিইউ এবং ইএমএস (ECUs and EMS)

ইলেকট্রনিক কনট্রোল সিস্টেম (ইসিইউ) এবং ইন্জিন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এখনকার প্রায় সব স্ট্রিট বাইকেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু স্ট্রিট বাইকের ক্ষেত্রে এগুলো এমনভাবে টিউনিং করা থাকে যেন তা জ্বালানী সাশ্রয়ী হয়।

ইন্জিন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ; Image Source: aemelectronics.com

তাই সিস্টেমের কার্যক্ষমতাকে অগ্রাহ্য করে মাইলেজের দিকে গুরুত্ব দিয়ে বাইকগুলোর স্টক ইন্জিন টিউন করা থাকে৷

এখনকার স্ট্রিট বাইক গুলোতে কিটসের সুবিধাও থাকে যার পরিপূর্ণ ব্যবহার স্টকে দেয়া থাকে না। ফলে টিউন করে ইসিইউ এর কার্যক্ষমতার সাথে সমন্বয় করে ফুয়েল রেশিও নির্ধারণ করে দিলে স্ট্রিট বাইকগুলোই রেসিং বাইকের মত পারফরম্যান্সে সক্ষম হয়ে ওঠে৷

শেষ কথা

মোটরসাইকেল কোম্পানি গুলো তাদের সব ধরণের এবং ডিজাইনের মোটরসাইকেল ইন্জিন মোডিফাইড করে প্রতি বছর নতুন নতুন ভার্সন যেভাবে বাজারে নিয়ে আসে, রাইডাররাও চাইলে সেভাবে নিজের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উন্নত করে নিতে পারে।

তবে সবার আগে রাইডারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সে কী চায় মোটরসাইকেল থেকে এবং মোটরসাইকেলটি সে ঠিক কিভাবে ব্যবহার করবে৷

মোটরসাইকেল ইন্জিন টিউনিং ব্যাপারটা লোভনীয় হলেও বেশ জটিল৷ একটা ইন্জিন তৈরীর সময় এর ডিজাইনার এবং নির্মাতারা এর পেছনে ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যায় করে একটি নিরাপদ এবং শক্তিশালী ইন্জিন তৈরী করতে৷ তাই হুট করে ইন্জিন টিউনিং করে একে তিনগুণ শক্তিশালী করে তুলে স্ট্রিট বাইককে রেসিং বাইকে যেমন পরিণত করা যায় তেমনি সেটা আবার আধামাইল চলার আগেই নষ্ট হয়ে যাবার ঝুঁকিও থেকে যায়।

সুতরাং ইন্জিন টিউনিং একটা চমৎকার ধারণা হলেও পরিপূর্ণ হিসাবনিকাশ করেই তাতে হাত দেয়া উচিৎ। তাছাড়া হাইস্পিড পারফরম্যান্স প্রয়োজন না হলে সাধারণ কিছু বদলের মাধ্যমেও মোটরসাইকেলের পারফরম্যান্স বাড়িয়ে নেয়া যায়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *