in

ড্রাইভিং পজিশন এবং লেনের ভিন্নতার মজার ইতিহাস

দেশের বাইরে বেড়াতে কিংবা কাজে গিয়ে রাস্তার কোন পাশে গাড়ি চালাবে, এটা নিয়ে প্রায়ই মানুষজন একটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়।

দেশে দেশে রয়েছে ড্রাইভিং লেন এবং পজিশনের ভিন্নতা ; Image Source: megagames.com

পুরো ব্যাপারটাই কিছুটা কঠিন হয়ে যায় চালকদের জন্য কারণ সম্পূর্ণ উল্টোদিকে মনোযোগ দিতে হয় অনেকসময়, যে অভ্যাসটা গড়ে উঠতেও কিছুটা সময় এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।

কোথায় কেমন

সাধারণ ধারণা দিতে গিয়ে সরলভাবে বলা যায়, ব্রিটেনে গাড়ি চালানো হয় রাস্তার বাম পাশ ধরে এবং আমেরিকার রাস্তার ডান পাশে।

সাধারণত ব্রিটিশ কলোনাইজ দেশগুলো, অর্থাৎ যে দেশগুলো একসময় গ্রেট ব্রিটেন শাসন করতো, পরবর্তীতে ব্রিটিশ রাণীর কাছে থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে, সেসব দেশের সংস্কৃতি গড়েই উঠেছে ব্রিটিশদের অনেকাংশের অনুকরণে।

ব্রিটেনের রাস্তার ড্রাইভিং লেন ; Image Source: autocar.co/uk

রাস্তার পাশ নির্ধারণে একই ব্যাপার দেখা যায়। ব্রিটিশ কলোনাইজ রাষ্ট্রগুলো যারা বর্তমানে কমনওয়েলথ সংস্থার সদস্য, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার এবং বাংলাদেশে দেখা যায় রাস্তার বাম পাশ ধরে গাড়ি চালাতে। এই নিয়ম কানুন আইনগুলো তৈরীই হয়েছে ব্রিটিশ শাসনামলে।

অন্যদিকে ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্র এবং আমেরিকায় দেখা যায় রাস্তার ডান পাশ ধরে গাড়ি চালাতে।

অবশ্যই সেখানকার রাস্তাগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণে চিহ্নিত সাইনবোর্ড দেয়া থাকে, যা অনুসরণ করলে ভুল করার সুযোগ কমই, তবুও হুট করে অভ্যাসের বিপরীতে চলতে গিয়ে সাময়িক অসুবিধার সম্মুখীন হতেই হয় অনেকেরই।

ভিন্নতার ইতিহাস

আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাব যে, কিছু কিছু দেশে ড্রাইভার গাড়ির বাম দিকে বসে। আবার কিছু কিছু দেশে ড্রাইভার গাড়ির ডান দিকে বসে। কিছু কিছু দেশে ডান দিক দিয়ে গাড়ি চালানো হয়। আবার কোনো কোনো দেশে বাম দিক দিয়ে গাড়ি চালানো হয়। ড্রাইভার কোন দিকে বসবে এবং কোন দিকের (ডান/বাম) লেন ব্যবহার করবে, এই রীতির প্রচলন কবে থেকে, আর কারাই বা এর প্রচলন করেন, তা কিন্তু অনেকেরই অজানা।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনুসন্ধানে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করা যায় যে, এই প্রচলন প্রথম শুরু করে রোমানরা। রোমানরা তাদের বিশাল সাম্রাজ্য শুধু দালান-কোঠাই নয়, তৈরি করেছিল সুপরিকল্পিত সড়ক ও মহাসড়ক। তাই তখন তাদের দরকার হয় সড়ক পরিচালনার জন্য সুষ্ঠু নিয়ম-নীতি।

মধ্যযুগের তখনকার দিনে সড়কগুলো ছিল অনিরাপদ। তাই তখন চালকরা গাড়ির বাম দিকে বসতো, যাতে প্রয়োজনের সময় ডান হাতের সাহায্যে অস্ত্রের ব্যবহার করতে পারে। তা ছাড়া তখন অশ্মারোহীরাও তাদের বাম হাতে রাখত ঘোড়ার লাগাম, যাতে ডান হাতের সাহায্যে পথে দেখা হওয়া পরিচিতজনদের সঙ্গে সহজেই করমর্দন করতে পারে। এভাবেই চালকের বাম দিকে অবস্থান এবং বাম হাতের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ জনগণেনর মধ্যে।

ঘোড়ায় চড়ার সময় হাতের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে লেন ঠিক করা হতো ; Image Source: ofhorse.com

ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এই রীতিটি আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পোপ অষ্টম বোনিফেস রোমে পবিত্র যাত্রা করতে ইচ্ছুক সবাইকে বাম দিকে বসার রীতি মেনে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই থেকে শুরু করে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিক পর্যন্ত বেশির ভাগ পশ্চীমা দেশগুলোতে এটি জনপ্রিয় ছিল।

১৮শ শতকের দিকে যুক্তরাষ্ট্রেও এই ব্যবস্থাটি পাকাপোক্ত হয়। তখন বিরাট বিরাট মালবোঝাই গাড়ি রাস্তায় চলত। তার সঙ্গে থাকত ১৫-২০টি ঘোড়ার বহর। সেই সময় ওইসব ঘোড়ায় টানা মালবাহী গাড়িতে চালকের জন্য কোনো বসার স্থান রাখা হতো না। তাই চালক সর্ব বামে থাকা ঘোড়ার পিঠে বসে তার বাম হাতের সাহায্যে ঘোড়ার লাগাম নিয়ন্ত্রণ করত। আর ডান হাতে থাকা লাঠির সাহায্যে বাকি ঘোড়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করত।

আর এই ব্যাপারটি নির্ধারণ করে দিল যে রাস্তার কোন দিক ব্যবহার করবে গাড়ির চালক। চালক বাম দিকে বসায় স্বাভাবিকভাবেই তার বাম দিক থেকে আসা গাড়িটি ভালোভাবে দেখতে পেত। আর যেকোনো সংঘর্ষ থেকে নিজের গাড়িকে খুব সহজেই রক্ষা করতে পারত। তাই চালকেরা রাস্তার ডান দিক ধরে গাড়ি চালাত। আর বাম দিক দিয়ে আসত অপর পাশের গাড়ি।

ইউরোপে ও যুক্তরাষ্ট্রের লেন প্রচলিত হয় ঘোড়া চালিত গাড়ির উপর ভিত্তি করে ; Image Source: ourwarwickshire.org

১৮শ শতকের শেষের দিকে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে এই নিয়মটি জনপ্রিয়তা পেল। ১৭৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভ্যানিয়ায় প্রথম এই নিয়মের পক্ষে আইন পাশ হয় এবং দ্রুতই কানাডা ও পুরো যুক্তরাষ্ট্রে এই আইন ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্রান্সের মাধ্যমে ইউরোপে এই নিয়মটির সূচনা হয়। ফ্রান্সে বাম দিক ধরে গাড়ি চালানোর নিয়ম প্রচলিত ছিল। কিন্তু কেন ফ্রান্স সেই প্রচলিত নিয়ম ত্যাগ করল তার সঠিক কারণ জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, ফরাসি বিপ্লবের পর পোপ কর্তৃক সকল প্রকারের নিয়ম ত্যাগ করার উদ্দেশ্যে তারা তাদের প্রচলিত নিয়মটি ত্যাগ করে।

আবার কোন কোন ইতিহাসবিদের ধারণা, এর প্রচলন করেছিলেন নেপোলিয়ন। তিনি যেসব দেশ জয় করেছিলেন, সেসব দেশেও এই নিয়ম চালু করেছিলেন। তার মধ্যে একটি হচ্ছে জার্মানি। বিংশ শতাব্দিতে জার্মানি তার দখলকৃত ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতেও এই নিয়ম চালু করে।

ইংল্যান্ডে তখনও প্রচলিত ছিল বাম দিক ধরে গাড়ি চালানোর পদ্ধতি। ১৭৫৬ সালে ব্রিটেনে এই সম্পর্কিত আইন পাশ হয়। যেহেতু পৃথিবীর বেশির ভাগ অঞ্চলেই ব্রিটিশদের রাজত্ব ছিল, তাই এই নিয়মটি বিশ্বের অধিকাংশ দেশে চালু হয়েছিল। অন্তত কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে এই নিয়মই প্রচলিত।

ব্রিটেন ছাড়া ইউরোপের সব দেশেই ডানদিকের লেন ধরে গাড়ি চালানো হয় ; Image Source: kitsapdailynews.com

তবে আমেরিকানরা একসময় বৃটিশদের দ্বারা শাসিত হলেও স্বাধীনতা লাভ করার পর নিজেদের দেশ থেকে তারা বৃটিশদের সব ধরণের ছোঁয়া মুছে ফেলতে চেয়েছে আর বৃটিশ আইনের সম্পূর্ণ বিপরীত নিয়মকে আইনে রূপান্তরিত করে উল্টোপথে গাড়ি চালানোর প্রচলন ও আইন করা হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও চালকের আসনের স্থান পরিবর্তন করেছে। কেউ ডান দিকে রেখেছে তো কেউ বাম দিকে। যে দেশে যে গাড়ির মডেল জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সে দেশের নিয়মও তার সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। যেমন- আমেরিকায় আগে চালকের জন্য ডান দিকে আসন রাখা হত। কিন্তু ফোর্ড কোম্পানি গাড়িগুলোর বাম দিকে চালকের আসন রাখত। আমেরিকায় এই গাড়িটি জনপ্রিয়তা পাওয়ায় সেখানে প্রচলিত নিয়মটি পরিবর্তিত হয়ে বাম দিকে চালকের আসন স্থায়ী হয়ে যায়।

এভাবেই দেশ থেকে দেশে গাড়িতে চালকের আসন অবস্থান ও গাড়ি চলাচলের ভিন্ন ভিন্ন লেনের প্রচলন হয়।

\

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *