in ,

পরিবেশবান্ধব গাড়িঃ সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ

বর্তমান বিশ্বে শক্তির প্রধান উৎস ডিজেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি। মানব সভ্যতায় এর অবদান ব্যাপক। গ্রামের কুঁড়েঘর থেকে শুরু করে আধুনিক সভ্যতার পরিবহন ব্যবস্থা-সর্বত্রই এর ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু হতাশার কথা হলো, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারে পরিবেশ দূষণ খুব বেশি ঘটে।

সবুজ জ্বালানীর গাড়ি ; Image Source: hddfhm.com

মোটর গাড়ি, এরোপ্লেন, জাহাজ, ট্রেন চালাতে ব্যবহূত জীবাশ্ম জ্বালানিতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। মোটর গাড়ি ও কলকারখানার নির্গত ধোঁয়ায় বাড়ছে উষ্ণায়ন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়াতে গলছে মেরু অঞ্চলের বরফ, উচ্চতা বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের, এভাবে চলতে থাকলে এক সময় বাসযোগ্যতা হারাবে পৃথিবী। বাংলাদেশের মতো নীচু দ্বীপাঞ্চলগুলো হারিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে সমুদ্রগর্ভে।

নগর পুড়লে দেবালয় কি আর এড়ায়

বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ক্ষতির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকলেও দূষণের মাত্রা বেশি উন্নত বিশ্বেই। দায় এড়িয়ে যেতে পারে না পশ্চিমা দেশগুলোও।

বৈশ্বিক উষ্ণতা ; Image Source: pitara.com

আর ক্ষতি কম বেশি পুরো পৃথিবীকেই বহন করতে হবে। তাই দূষণ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগে তাদেরও সমপরিমাণ আগ্রহই প্রকাশ পাচ্ছে।

গ্রীন এনার্জিঃ সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ

জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে তাই গ্রীন এনার্জির দিকে ঝুঁকছে অনেক দেশ। ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য, ভারত, ফ্রান্স এবং নরওয়ের পাশাপাশি আরো কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে গ্যাস এবং ডিজেলের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে আনতে চায় তারা।

বায়ু বিদ্যুৎ ; Image Source: nuenergy.org

জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে ইলেকট্রিক এবং হাইব্রিড গাড়ি তৈরির ওপর জোর দিতে চান তারা। এখন পর্যন্ত সবুজ জ্বালানি বিষয়ে নিজেদের আন্তরিকতা প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কানাডা, নরওয়ে, ভারত, জার্মানি,   সুইডেন এবং নেদারল্যান্ডস। বিশ্বের উত্পাদিত বিদ্যুত্ নির্ভর গাড়ির ৯৫ শতাংশই বিক্রি হয় এই দশটি দেশে।

যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে সম্প্রতি বলা হয়েছে, দেশকে পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে ২০৪০ সালের মধ্যে গ্যাস এবং ডিজেল চালিত গাড়ি উৎপাদন থেকে সরে আসতে চায় তারা। ২০৫০ সালের মধ্যে রাস্তায় কোন ডিজেল চালিত গাড়ি চলতেই পারবে না। ঐ সময়ে সব গাড়িকে দূষণের পরিমাণ শূন্য মাত্রায় রাখতে হবে। যুক্তরাজ্যের পরিবেশ বিষয়ক সেক্রেটারি মিচেল গোভে বলেন, দূষণের হাত থেকে নতুন প্রযুক্তির কোন বিকল্প নেই। জ্বালানি হিসেবে ভবিষ্যতে ডিজেল এবং পেট্রল নিষিদ্ধ করা হবে। আইএইচএস মার্কিটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক স্টিফেনি ব্রিনলি বলেন, এই পদ্ধতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা থাকতে হবে। সরকার আইন করলে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তা মেনে নিতে বাধ্য।

যুক্তরাজ্যের আগেই ফ্রান্সের পক্ষ থেকেও একই ধরনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সতর্কতা মাথায় রেখে ২০৪০ সালের মধ্যে গ্যাস-ডিজেল চালিত গাড়ি উত্পাদন বন্ধ করে দেবে ফ্রান্স। ঐ সময়ের পর গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু বিদ্যুৎচালিত কিংবা অন্য সবুজ জ্বালানির গাড়ি বিক্রি করতে পারবে।

ফ্রান্সের পরিবেশগত পরিবর্তন বিষয়ক কমিটির প্রধান নিকোলাস হুলোট বলেন, ফ্রান্সের মোট যানবাহনের মাত্র ৪ শতাংশ বিদ্যুৎ, হাইব্রিড এবং বিকল্প জ্বালানি নির্ভর। তবে আশার কথা হলো, গত বছরের প্রথম তিন মাসে বিক্রি হওয়া মোট গাড়ির ২৫ শতাংশই ছিল সবুজ জ্বালানি নির্ভর। এটাই প্রমাণ করে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। একই সাথে সবুজ জ্বালানি নির্ভর গাড়ি উৎপাদনে এগিয়ে আসছে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। আর এই লক্ষ্য নির্ধারণের ফলে আগামীতে বিশ্ব বাজারেও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে ফ্রান্সের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

গত বছরের শুরুতেই ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের প্রত্যেক গাড়িতে বিদ্যুত্ নির্ভর জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা অনিল কুমার জৈন বলেন, এটি শুনতে অনেকটা উচ্চাকাঙ্খার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু চেষ্টা করলে অবশ্যই তা সম্ভব। ভারতের বেশ কয়েকটি শহর দূষণের দিক দিয়ে শীর্ষের তালিকায়। দিল্লিবাসী তো গত কয়েকবছর ধরেই বসবাস অযোগ্য এক শহরে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে।  একারণেই বিকল্প জ্বালানির বিষয়ে বেশ আন্তরিক ভারত সরকার।

সৌর বিদ্যুৎ চালিত যানবাহন

আমাদের দেশে সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস পানি বিদ্যুৎ। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের যত পদ্ধতি রয়েছে, তাদের মধ্যে কয়লা এবং পানি বিদ্যুৎ পরিবেশের জন্য কিছুটা ক্ষতিকরই।

পানি বিদ্যুৎ ; Image Source: studentenergy.org

বাংলাদেশ যেহেতু সল্প আয়তনের অধিক জনগোষ্ঠীর একটি রাষ্ট্র, আর অন্যদিকে বায়ু বিদ্যুতের জন্য একটা বিশাল শুন্য জায়গার প্রয়োজন, তাই বায়ু বিদ্যুতের উৎপাদন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশ দুঃসাধ্য।

তবে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন চমৎকার একটি সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য। আর সম্ভাবনাটির বেশ ভাল সদ্ব্যাবহার শুরু হয়েও গেছে গ্রামাঞ্চলে।

সৌর বিদ্যুতে চার্জ ; Image Source: greencarenergy.org

তবে সৌর বিদ্যুৎ চালিত যানবাহনের প্রচলন এখনো শুরু হয়নি। যেহেতু প্রযুক্তিটি একেবারেই নতুন, ব্যবহারযোগ্য উন্নয়নও তেমন হয়নি, তাই এখনো সেক্টরটিকে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য তাদের দোরগোড়ায় পৌছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, তবে বিজ্ঞানী – গবেষকদের দাবি অনুযায়ী, প্রযুক্তি সঠিক পথেই আছেন।

পিছিয়ে নেই আমাদের দেশের গবেষকরাও। সম্প্রতি সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তৈরি করেছেন, ‘সৌরশক্তি চালিত গাড়ি’।

সৌর শক্তি চালিত অটোরিকশা ; Image Source: autorickshaw.org

সূর্যের শক্তির সাহায্যে চলবে তিন চাকার এই ভিন্নধর্মী গাড়ি। গাড়িটি তৈরির উদ্যোক্তা যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবির।

সৌরশক্তি ব্যবহার করে গাড়ি চালানোর আইডিয়া সম্পর্কে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সৌরশক্তি দিয়ে ফ্যান, লাইট ইত্যাদি যেহেতু চলে তাই আমার মাথায় আসে তাহলে গাড়িতে এটা ব্যবহার করা হচ্ছে না কেন। তখন ভিডিওতে ‘টেসলা’ নামে এক অ্যামেরিকান গাড়ি কোম্পানির ব্যাটারি চালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণ করা দেখেছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই আমার মনে সংকল্প আরো দৃঢ় হয়, আমি নিজেই সৌরশক্তি ব্যবহার করে গাড়ি তৈরি করতে পারব।

প্রকল্পটি শুরু করেছিলাম ২০১৮ সালের জুনে। যবিপ্রবির ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গবেষণা তহবিল থেকে বরাদ্দ পেয়েছিলাম গাড়ি তৈরির সব খরচ। স্থানীয় এক গ্যারেজে তৈরি করেছি এই সৌরশক্তি চালিত গাড়ি। গাড়ির সমস্ত যন্ত্রপাতি দেশীয় বাজার থেকে সংগৃহীত। মাত্র দেড় লাখ টাকার মধ্যে বানিয়ে ফেললাম সৌরশক্তিচালিত এই গাড়ি। একদিনের চার্জে সর্বোচ্চ ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে সক্ষম। আমার তৈরি এই গাড়িটি একজন চালকসহ দুইজন যাত্রী বহন করতে পারে। গাড়িটি সর্বোচ্চ ৩৩০ কেজি ভার বহন করতে পারে।’

আপাতদৃষ্টিতে খুবই প্রাথমিক মনে হলেও শুরু হিসেবে চমৎকার বলেই ধরে নেয়া যায়৷ যেহেতু কাজটি করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে, তাই পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা পেলে সৌর বিদ্যুৎ চালিত যানবাহন যে বিশাল এক দুশ্চিন্তার দারুণ সমাধান হয়ে উঠতে পারে, কোন সন্দেহ নেই তাতে।

দিনশেষে পৃথিবীটা আমাদেরই, আমাদের শেষ আশ্রয়, ঠিকানা। তাই দূষণ যতটা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা যায়, একটা সবুজ এবং দূষণমুক্ত পৃথিবী আমাদের অনাগত সন্তানের জন্য রেখে যাওয়া আমাদেরই দায়িত্ব।

\

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *