in ,

বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ইলেকট্রনিক মোটরসাইকেল

বিকল্প শক্তির খোঁজে আছে পৃথিবী। আর এ কারণেই বৈদ্যুতিক যানবাহন দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দেশে দেশে। আধুনিক বিশ্বের দেশগুলোতে উন্নত প্রযুক্তির বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হয়েছে বহু আগেই, যা আক্ষরিক অর্থেই একরকম বিদ্যুৎ গতিতে চলে। একই প্রযুক্তি সম্প্রতি ব্যবহৃত হচ্ছে বাসসহ অন্যান্য যানবাহনেও।

বিকল্প শক্তির উৎস খোঁজা পৃথিবীর টিকে থাকার জন্যই প্রয়োজনীয় ; Image Source: greenandgrow.com

তবে বাইকের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক বাইক তৈরীর ব্যপারটাও বেশ পুরাতন। তৃতীয় বিশ্বের অনেক জায়গায়ই ইলেকট্রিক বাইক ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল রীতিমতো বিপ্লব সৃষ্টি করেছে বড় শহরগুলোর রাস্তায়। প্রথমদিকে নারী এবং বৃদ্ধদের পছন্দ ছিল যানবাহনটি। এছাড়া শখ করেও কেউ কেউ কিনেছে বৈদ্যুতিক এই যানটি। তবে গত দুই বছরে এদের উৎপাদন বিক্রি ছাড়িয়ে গেছে সব রেকর্ড। রাস্তায় এদের চলাচল দেখলেও তা আন্দাজ করা যায়৷

হার্লে ডেভিডসন ব্র্যান্ড থেকে বেরুচ্ছে স্টাইলিশ সব ইলেকট্রনিক মোটরসাইকেল ; Image Source: harley-Davidso.com

বাংলাদেশে ইলেকট্রিক স্কুটার, ইলেকট্রিক বাইক দারুণ জনপ্রিয়। আর গত কয়েক বছরে ইলেকট্রিক থ্রি হুইলার দেশের রাস্তায় এমন বিপ্লব ঘটিয়েছে যে পেশী শক্তিতে চালানো রিক্সা ভ্যান প্রায় দেখাই যায় না রাস্তাঘাটে।

তবে বাংলাদেশে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল এখনো শখের পর্যায়েই রয়েছে৷ জনমানুষের মধ্যে এখনো তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল। রাস্তায় বেরুলেও কদাচিৎই আমরা ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল দেখতে পাই।

নির্দিষ্ট কিছু কারণে বেশ কয়েক বছর আগে থেকে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল বাজারে আসলেও তেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি,

চার্জ শেষ?

‘চার্জ শেষ’ কথাটি মোটামুটি মিথের পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু এটাই সত্যি। বেশিরভাগ ইলেকট্রিক স্কুটার ব্র্যান্ড তাদের প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন করতে গিয়ে সারাদিন চার্জ থাকার কথা বলে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের রেন্জ থাকে অনেক কম। আর আমাদের দেশের অমসৃণ উঁচুনিচু ভাঙ্গা রাস্তায় চার্জিং রেন্জ আরো কমে যায়।

আর স্কুটারের এমন রেন্জ দেখে মানুষের মনে ভয় আতঙ্ক কাজ করে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রেও। আর স্কুটারের চেয়ে মোটরসাইকেলে মানুষ আরো বেশি ব্যাকআপের আশায় কেনে।

চার্জই মূল সমস্যা ; Image Source: aliexpress.com

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে বাজারে থাকা ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলগুলো একবার চার্জে গড়ে পঞ্চাশ থেকে সত্তর কিলোমিটার যেতে পারে। অর্থাৎ শহরের ভেতরে থাকলেও কখনো কখনো আপনি বিকল হয়ে বসতে পারেন আর শহরের বাইরে যাওয়ার কথা তো ভাবাই অসম্ভব।

ব্যয়বহুল

সত্যি বলতে ব্যয়বহুলতা একটা ভালো কারণ ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল মানুষের কাছে জনপ্রিয় না হওয়ার। পেট্রো এনার্জিতে চলা গাড়ির তুলনায় এদের দাম কম তো নয়ই, কিছুটা বেশি বা সমান হওয়ায় মানুষ ঝুঁকিতে যেতে চায় না। আবার সস্তা ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল কিনতে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ কারণ এদের ব্যাটারি রেন্জ কম থাকবে।

চার্জ করাও সময়সাপেক্ষ

অন্য সব ইলেকট্রিক পণ্যের মতো, আপনাকে ইলেকট্রিক টু হুইলার নিয়মিত চার্জ করতে হবে। সমস্যার শুরুটাও এখানেই, অন্য সব ইলেকট্রিক পণ্যের মতো আমাদের দেশে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলও দীর্ঘ সময় নিয়ে ফুল চার্জ হয়। চার্জিং টাইম সব সময়ই অনেক হয়ে থাকে।

চার্জ করা সময়সাপেক্ষ বলে মানুষের আগ্রহ কমে যায় ; Image Source: alibaba.com

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাটারি পুরোপুরি চার্জ হতে সারারাত লেগে যায় আর এ সময়ের রেন্জটা ক্রমশ বাড়তেই থাকে ব্যবহারের সাথে সাথে।

ডেড ব্যাটারি এবং রিপ্লেসমেন্ট

ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল কিংবা স্কুটারে অনুৎসাহিত হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত এটাই, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া যায় এমন বেশিরভাগ মডেলই দূর্বল ব্যাটারি দিয়ে তৈরী করা, সম্ভবত সুলভ মূল্যে যাতে বাজারে নিয়ে আসা যায়, সেই লক্ষেই খরচ কমাতে এটি করা হয় যেহেতু খরচ বেশি হলে সাধারণ মানুষ পেট্রো এনার্জিকেই এখনো অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।

আর ফলাফল হিসেবে স্বাভাবিক ব্যবহারের পরও ব্যাটারি ডেড হয়ে যায় এক বা দুই বছর পরই। আর ব্যাটারি রিপ্লেসমেন্টে মেলে আরো বড় দুঃস্বপ্ন।

দেশীয় বাজারে ব্যাটারির সহজলভ্যতা নেই ; Image Source: ebay.com

একদিকে ব্যাটারি রিপ্লেসমেন্ট বেশ ভালো রকমের ব্যয়বহুল, অন্যদিকে মানসম্মত ব্যাটারি পাওয়াও দুষ্কর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডেফল্ট ব্যাটারির চেয়ে রিপ্লেসমেন্ট ব্যাটারির গুণগত মান এবং কার্যকারিতা কম হয়ে থাকে।

অনেক সময় এমনও হয় যে সে মডেলের মোটরসাইকেলের ব্যাটারি দেশে পাওয়াই যাচ্ছে, তখন ঝক্কিঝামেলা ও খরচ বাড়ে আরো।

আর বড় অংকের টাকা খরচ করে মোটরসাইকেল কেনার কিছুদিন পর আবার একটা মোটামুটি বড় অংকের টাকা খরচের ঝক্কিতে কেউই যেতে চায় না।

রেজিস্ট্রেশন নেই

আইনগত এই বাঁধার কারণেই আমদানীকারকরা ভালো মানের এবং দামী ইলেকট্রনিক মোটরসাইকেল দেশে আমদানি করতে চায় না। বৈদ্যুতিক যানবাহনের কোন ধরণের পারমিট অথবা রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া রাখেনি বিআরটিএ।

রেজিষ্ট্রেশনে সুব্যবস্থা না থাকায় গ্রাহক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে ; Image Source: bikebd.com

তার মানে হচ্ছে, যে কোন সময় ট্রাফিক পুলিশ আটকাতে পারে আপনাকে। তা যদি কোনভাবে এড়িয়েও যাওয়া যায়, আরো বড় সমস্যা থেকেই যায়।

চুরি বা ছিনতাই হয়ে গেলে মোটরসাইকেল ট্র্যাক করে ফিরিয়ে আনার জন্য কোন আইনগত সহায়তা নেয়াও সম্ভ হয় না।

এক্স ফ্যাক্টর

ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলে কিছু একটা যেন মিসিং থাকে। ইলেকট্রিক স্কুটার যখন বাংলাদেশে আসে, তখনো দেখা গেছে বয়স্ক মানুষ ছাড়া তেমন কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

বিশেষত প্যাশনেট রাইডাররা একরকম অবহেলাই পোষণ করেন ইলেকট্রনিক মোটরসাইকেল সম্পর্কে। হয়তো বাংলাদেশে আসা ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলগুলোর তুলনামূলক কম গতি এবং উচ্চশব্দে অভ্যস্ত কানে শব্দহীন রাইড তাদের মস্তিষ্ক নিতে পারে না।

অজানা কারণে প্যাশনেট রাইডারদের অনিহা রয়েছে ইলেকট্রনিক মোটরসাইকেলে ; Image Source: dailygazette.com

কিন্তু দিন শেষে, পৃথিবীর জ্বালানী শক্তি সীমিত এবং তা ক্রমশ শেষের দিকেই। আর আমাদের মত খনিজ শক্তি সল্পতার দেশে ব্যাপারগুলো আরো ভয়াবহ।

আর উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারই একমাত্র সমাধান। জিরোর মতো কিছু কোম্পানি ইলেকট্রনিক মোটরসাইকেল বাজারে আনছে বর্তমানে যা সত্যকার অর্থেই ভালো। এছাড়া এনার্জিকা, ব্রুটাস সহ আরো অনেক ব্র্যান্ড প্রতিশ্রুতিশীল বাজার প্রদর্শন করছে। এখন ইলেকট্রনিক যানবাহন বিপ্লবে প্রয়োজন শুধু গ্রাহকদের সদিচ্ছা।

\

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *