in ,

মোটরসাইকেল কেনার আগেই লাগবে বাধ্যতামূলক ড্রাইভিং লাইসেন্স

বাংলাদেশের মত দ্রুত গতিতে উন্নয়নশীল দেশের মানুষ ব্যক্তিগত যানবাহনে আগ্রহী হবে, এটাই স্বাভাবিক। আবার ঢাকার মত জনবহুল জ্যামের নগরীতে গাড়ির চেয়ে মোটরসাইকেলকে কিছুটা সহজ ও দ্রুত যান ভেবে অনেক মানুষই একে পছন্দ করছেন, তা বিক্রির হার দেখলেই অনুমান করা যায়।

পরিসংখ্যান

২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত বিআরটিএ ভিহিকল রেজিষ্ট্রেশনের হিসাব দেখলে ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হয়ে যায়। ৪০ লাখ ১৮ হাজার ভিহিকল বিআরটিএ কতৃক রেজিস্ট্রার্ড হয়েছে যার মধ্যে ২৬ লাখ ৭১ হাজারই মোটরসাইকেল রেজিষ্ট্রেশন শুধু। এ হিসাব গত চার বছর পাঁচ মাসের।

শো রুম থেকে রেজিস্ট্রারড মোটরসাইকেলের তুলনায় ড্রাইভিং লাইসেন্স একদমই কম ; Image Source: 300southwine.com

আবার বিআরটিএ’রই অন্য পাতার হিসেব দেখলে আতঙ্কিত হতে হয়, স্বাধীনতার পর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে বিআরটিএ কর্তৃক ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে মাত্র ১০ লাখ ৫৩ হাজার।

বিআরটিএ’র হিসেবেই বেরিয়ে এসেছে, বাংলাদেশে ড্রাইভিং-এ আইন প্রয়োগ এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, দুটোরই কী ভয়ংকর করুণ অবস্থা।

শুধু ২০১৯ সালের প্রথম পাঁচ মাসের হিসেবটাই দেখুন, ১ লাখ ৭৭ হাজার মোটরসাইকেল রেজিষ্ট্রেশন হয়েছে এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে, অন্যদিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স নেয়ার সংখ্যা মে মাস পর্যন্ত মাত্র ১১৭৩ টি।

সড়ক দুর্ঘটনার হিসেব কষেও দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দূর্ঘটনা তুলনামূলক অনেক বেশি। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট থেকে গত বছর এক রিসার্চে বলা হয়, প্রতি বছর ঢাকা যত দূর্ঘটনা ঘটে, তার ২৪.৪৭ শতাংশ ঘটনায় জড়িত থাকে মোটরসাইকেল।

তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৭ সালে ২৬৩ টি দূর্ঘটনা ঘটে রাজধানীতে এবং ১৮.২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে জড়িত ছিল মোটরসাইকেল।

মত বিনিময় সভায় সিদ্ধান্ত

এসব কারণেই গতমাসে, রোড ট্রান্সপোর্ট এন্ড হাইওয়ে ডিভিশন (Road Transport and Highway Division – RTHD) একটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আয়োজন করে মোটরসাইকেল আমদানীকারক, প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা প্রতিনিধিদের সাথে।

আলোচনা অনুষ্ঠানে, নজরুল ইসলাম, আরটিএইচডি’র সাধারণ সম্পাদক এসব বিষয় তুলে এনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেন। পরবর্তীতে তারা কয়েকটি প্রস্তাবে একমত পোষণ করেন। যদিও কিছু কোম্পানি এর বিরোধিতাও করেন।

রয়েছে ভিন্নমতও

তাদের মত বাংলাদেশে মোটরসাইকেল শিল্প একটি সম্ভাবনাময় অবস্থায় আছে, ঠিক এই সময়ে এসে এসব বাধ্যবাধকতা ব্যবসার অগ্রগতিতে বাঁধাগ্রস্থ করবে।

বর্তমান নিয়ম

তবে এসব বিরোধিতাকে আমলে নিচ্ছে না কতৃপক্ষ, তা বোঝাই যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায়, বিআরটিএ ঘোষণা দিয়েছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখানো এখন থেকে বাধ্যতামূলক মোটরসাইকেল কেনার আগে।

অর্থাৎ ডিলার অথবা শো-রুম যে জায়গা থেকেই ক্রেতা মোটরসাইকেলটি কিনুক না কেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে ক্রেতাকে মোটরসাইকেল না দেয়ার ব্যাপারে আইন আসছে মোটরসাইকেল বিক্রেতাদের কাছে।

সকল বিক্রেতা, প্রস্তুতকারক, নির্মাতা ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসনিক চিঠি দিয়েছে বিআরটিএ গত মাসের ১৩ তারিখ।

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল রেজিষ্ট্রেশন করবে না বিআরটিএ ; Image Source: daily-sun.com

জুলাই থেকে বিক্রি হওয়া প্রতিটি মোটরসাইকেলের সাথে ক্রেতার ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার প্রমাণপত্র দাখিল করতে না পারলে মোটরসাইকেল রেজিষ্ট্রেশন দেবে না বিআরটিএ। অর্থাৎ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল কিনলে ড্রাইভিং লাইসেন্স না পাওয়া পর্যন্ত রাইডার এবং বাইক দুটোই অবৈধ। পুলিশ অথবা যে কোন আইন প্রয়োগকারী বাহিনী যে কোন সময় আটকে দেয়ার অধিকার রাখে আপনাকে।

নতুন মোটরসাইকেল ক্রেতাদের ক্ষেত্রেও অন্তত লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে এমন ক্রেতাদের কাছেই মোটরসাইকেল বিক্রির অনুমতি মিলেছে কোম্পানিগুলোর।

মোটরসাইকেল কোম্পানিগুলোর অভিমত

মোটরসাইকেল কোম্পানিগুলো এখন পর্যন্ত যদিও এসব সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে আসছে। তাদের ভাষ্যমতে, বর্তমানে একজন ব্যক্তিকে লাইসেন্স পেতে হলে প্রথমে তাকে লোকাল বিআরটিএ অফিস থেকে লার্নার কার্ড সংগ্রহ করতে হবে । এরপর বিআরটিএ তাকে সময় দেবে লিখিত, মৌখিক ও প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য । এই তিনটি পরীক্ষায় পাস করলেই কেবল তাকে লাইসেন্স প্রদান করা হবে।

তিনটি পরীক্ষায় পাশের পরই মেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স ; Image Source: glassdoor.co

কিন্তু এই পদ্ধতিটি অনেক জটিল এবং সময় সাপেক্ষ। এটি সম্পন্ন করতে প্রায় ছয় থেকে এক বছর লেগে যায় । আর এই কারনের ব্রোকারের একটি চক্র তৈরি হয়েছে। এই ব্রোকারদের সাথে যুক্ত হয়েছে বিআরটিএ এর কিছু অসৎ স্টাফ, যারা টাকা বা ঘুষ খেয়ে দ্রুত পেপার্স তৈরি করে দেয়।
মোটরসাইকেল কোম্পানি গুলো এই দিকটায় লক্ষ্য রাখতে বলেছেন। যাতে করে লোকজন দ্রুত ও ঝামেলা মুক্ত ভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে পারে।

প্রশিক্ষণও দেবে নির্মাতা ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান

বিআরটিএ এবং আরটিএইচডি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান। সেই সাথে মোটর সাইকেল কোম্পানিগুলোকে আহবান জানান, তারা যেন কিভাবে সহজে মোটরসাইকেল রেজিষ্ট্রেশন করা যায়, সে বিষয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দিয়ে বুক লিট প্রদান করতে৷ কারো যদি ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকে, তাহলে তাকেও সহযোগিতা করা, কিভাবে সহজে ড্রাইভিং লাইসেন্স করা যায় সে বিষয়ে পর্যাপ্ত সাহায্য করে তাকে উৎসাহ দেয়া সে যেন অন্তত লার্নার লাইসেন্স পেয়েই মোটরসাইকেল কিনতে আসে।

ট্রেনিংগ্রাউন্ড রাখতে হবে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানদেরও ; Image Source: lockandlean.com

এছাড়া মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এবং বড় ডিলারদের প্রতি উপজেলা শহরে অন্তত একটি ড্রাইভিং শেখার গ্রাউন্ড রাখার পরামর্শ দিয়েছে বিআরটিএ। এতে করে মোটরসাইকেল রাইডারদের সঠিক ভাবে বাইক চালানো এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকবে বলে মনে করেন তারা।

মোটরসাইকেল তৈরি ও আমদানী কারক এসোশিয়েশন এর প্রেসিডেন্ট মিস্টার হাফিজুর রহমান খান এইসব সিদ্ধান্তের সাথে একমত হয়েছেন । তিনি বলেছেন, “আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।”

এছাড়া তিনি আরও বলেছেন যে, আসলে তাদের কাছ থেকে যারা মোটরসাইকেল কিনতে থাকেন বা কেনেন তারাই কি প্রকৃত ভাবে মোটরসাইকেল চালান কিনা । আসলে এটা বলা মুশকিল যে মোটরসাইকেল ক্রয়ের পর সেটা কে রাইড করেছেন সেটা নির্নয় করা।

হাফিজুর রহমান খান হচ্ছেন রানার অটোমোবাইলস এর চেয়ারম্যান । তিনি বলেছেন যে তাদের ১৮টি জেলায় রাইডার ট্রেইনিং সুবিধা রয়েছে, যেখান ইতিমধ্যে রাইডারদের ট্রেইনিং দেয়া হচ্ছে।

অন্য সব কোম্পানি এবং প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও এভাবে এগিয়ে এলে হয়তো সত্যিই মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট সর্বোপরি সবরকম দূর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *