in , ,

বাইসাইকেলের প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক উপকরণ

বাইসাইকেলের প্রথাগত দোকানগুলোতে এতো বিশাল পরিসরে সাইকেলের আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র পাওয়া যায় যে, দোকানে ঢোকার পর আমাদের বুদ্ধিভ্রংশ ঘটে।

কেমন সাইকেল কিনবো এই সংশয়কে কাটিয়ে সাইকেল কিনে ফেলার পর আবারো সংশয়ে পড়ে যাই।

ক্যামেলব্যাক কী? টার্বো ট্রেইনার কেন প্রয়োজন হতে পারে? 

এমন হাজারটা প্রশ্ন মাথার ভেতরে ঘুরপাক খেতে থাকে, কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে, এখানে থাকা সবকিছুই আপনার প্রয়োজনীয় নয়। অনেক মানুষ খুব ভাল ভাবে রাইড করছে সাধারণ কাপড় পরেই, হয়তো পেছনে সাধারণ একটা রাক্সাক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বহন করতে৷

তবে কিছু জিনিস সত্যিই প্রয়োজনীয়, যদি আপনি সমতল রাস্তার বাইরে, শুকনো পরিবেশে অথবা গ্যারেজ নেই এমন কোন অনিরাপদ স্থানের আশে পাশে সাইকেল চালাতে চান।

অনেক রকম আনুষাঙ্গিক উপকরণ রয়েছে রাইডিং এর জন্য, এদের মধ্যে কিছু আপনার রাইডিংকে সহজ, সহনীয় ও আরামদায়ক এবং নিরাপদ করে তুলবে, আবার কিছু উপকরণ রয়েছে যেগুলো তেমন কাজে না লাগলেও দেখতে ভালো লাগে বলে অনেকেই ব্যবহার করেন৷

আজ আমরা প্রয়োজনীয় এমন সব সাইকেলের আনুষাঙ্গিক উপকরণ নিয়ে আলোচনা করবো,

লক ( Lock)

আপনি যদি আপনার বাইকটি চালিয়ে গন্তব্যে পৌছার পর রাস্তায় রেখে কাজে যেতে হয়, তাহলে আপনাকে যাওয়ার আগে অবশ্যই সাইকেলকে লক করতে হবে।

বাইক লক ; Image Source: bikeradar.com

এক্ষেত্রে আপনি যেমন খরচ করবেন, তেমনই পাবেন বলা যায়৷ ভালো তালা সস্তায় তেমন পাওয়া যায় না। তবে সেরা তালাগুলো যেহেতু চোরদের পাওয়ার টুলের বাইরে, তাই একটু বেশি দামে তালা নিয়ে চোরদের বাধ্য করতে পারেন আপনার সাইকেল থেকে চোখ সরিয়ে অন্য কোথাও খুঁজতে৷

কোন তালা বেশি নিরাপদ এবং ভালো, এটা দেখেই বলে দেয়া মোটামুটি অসম্ভব।  তবে আমাদের পরামর্শ থাকবে ডি শেইপ লকগুলোর প্রতি যার চারপাশে হাতকড়ার মত আর্মারিং থাকায় বেশি ভাল কাজ করে। একই ভাবে চাবির ক্ষেত্রে চ্যাপ্টা চাবিকে এগিয়ে রাখা যায় কারণ সিলিন্ডার চাবি সহজেই আক্রমণ করা যায়।

লাগেজ

বাইক রাইড করার সময় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বহনের অনেক উপায় আছে। শুধু চাবি এবং টাকা রাখার জন্য সাধারণ কাঁধ ব্যাগ থেকে শুরু করে রাক্সাকের ফুল সেট যা মহাদেশ পাড়ি দেয়ার জন্যও যথেষ্ট। কোনটি সেরা তা নির্ভর করছে আপনি কোন ধরণের রাইডিং করতে চান বা করে থাকেন তার উপর।

রাক্সাক ; Image Source: bikeradar.com

শহরে বা শহরের আশেপাশে রাইডের জন্য, হালকা বোঝাই হবে এমন ক্ষেত্রে ছোট, কমপ্যাক্ট রাক্সাক নিতে পারেন যাতে চেপে থাকা স্ট্রেপস আছে কাঁধে আটকে রাখার স্থিরভাবে অথবা ব্যবহার করতে পারেন কুরিয়ার স্টাইলের কাঁধ ব্যাগও।

শরীরের সাথে লেগে থাকা ব্যাগের সুবিধা হচ্ছে আলাদা ওজন বোঝা যায় না কারণ নিজের সাথেই সামনে চলন্ত দিকে এগোতে থাকে, আর অসুবিধা হচ্ছে, শরীরের সাথে লেগে থাকায় শরীরের ওই অংশটুকু খুব সহজে ঘেমে যায়।

তবে ড্রপ হ্যান্ডেলবারের ক্ষেত্রে কাঁধ ব্যাগ বহন কষ্টকর।

আপনার রাইড যদি লম্বা হয়, তাহলে সবচেয়ে ভালো হবে যদি সাইকেলকেই ব্যাগটা বহন করতে দেয়া যায়।

আর র্যাক অথবা প্যানিয়ারস যথেষ্ট জায়গা দেয় অফিসে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয়  সামগ্রী নিতে, এমনকি চাইলে সপ্তাহান্তের বাজারটাও করে ফেলতে পারেন।

আপনি যদি একটু দূরে কিংবা রাস্তার বাইরে কোথাও রাইডে যান, সেক্ষেত্রে রাক্সাকের অনেক রকম থেকে আপনার পছন্দ করার সুযোগ থাকবে৷

আবার যদি মাউন্টেইন রাইডে যান, সেক্ষেত্রে ওয়াটার বোটল রাখার সুযোগ থাকতেই হবে।

বৃষ্টি নিরোধক জ্যাকেট

বৃষ্টির আওতায় থাকতে না চাইলে সাইক্লিং জ্যাকেট আপনার রাইডিং পজিশনের সাথে ফিট হতে হবে৷ রেগুলার জ্যাকেটের চেয়ে সাইক্লিং জ্যাকেট একটু অন্যরকম হয়ে থাকে। সাধারণত পেছনে একটু লম্বা থাকে সামনের তুলনায়, তেমনি হাতও কিছুটা লম্বা হয়ে থাকে। 

ওয়াটার প্রুভ জ্যাকেট ; Image Source: bikeradar.com

সহজেই দেখা যায় এমন রঙের, সেইসাথে রিফ্লেক্ট করে এমন উপকরণ দিয়ে সাইক্লিং জ্যাকেট বানানো হয় নিরাপত্তার জন্য।

তবে সেরা জ্যাকেট সেইগুলোই যা একই সাথে বৃষ্টি নিরোধক কিন্তু দম আটকানো নয়। তাই দেখে শুনে ট্রায়াল দিয়ে তারপর জ্যাকেট কিনুন যাতে আপনাকে ভয়ংকর ব্যাগ বয়েল সিনড্রোমে না পড়তে হয়।

মাডগার্ডস/ফেন্ডার্স

সাইকেলে মাডগার্ডস খুবই গুরুত্বপূর্ণ, চাকার সাথে উঠে আসা ধুলো এবং কাঁদা যাতে উপরে উঠে এসে রাইডারের কাপড়চোপড় নোংরা না করে ফেলে, সে জন্যই মাডগার্ডস ব্যবহার করা হয়। কিছু সাইকেল যাদের লুক রেসিং না, সেসব সাইকেলে শুরু থেকেই মাডগার্ডস লাগানো থাকে৷

মাডগার্ডস ; Image Source: bikeradar.com

আপনি যদি শহরে থাকে, এবং জলবায়ু যদি শুকনো হয় তাহলে হয়তো মাডগার্ডস খুলে রাখলেও সমস্যা নেই তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে স্প্রে রাখার পরামর্শ দেয়া যেতে পারে।

তাছাড়া মাউন্টেইন বাইক কিংবা ক্রুজার বাইক নিয়ে সেসব অঞ্চলে গেলে মাডগার্ডসের কোন বিকল্প নেই।

সামনে এবং পেছনের লাইট

খুবই প্রয়োজনীয় যদি আপনি অন্ধকার অঞ্চলে রাইড করতে যান। সাইকেল কিংবা বলা যায় সব যানবাহনেই লাইট দুটো কাজ করে, সামনের পথ আলোতে দৃশ্যমান করার সাথে সাথে আপনাকেও দৃশ্যমান করে তোলে রাস্তায় চলা অন্যান্য যানবাহনের চালকদের কাছে।

লাইট ; Image Source: bikeradar.com

শহরে, যেখানে আনাচে কানাচে আলোর বন্যা, সেখানে লাইটের তেমন প্রয়োজন নেই। তবে হালকা আলোর পরিবেস্টনকারী লাইটই যথেষ্ট, যাতে রাস্তায় থাকা অন্যান্য চালকেরা সহজেই আপনাকে লক্ষ্য করতে পারে, আলোর প্রতিফলনের ফলে আপনার এবং আপনার বাইকের অবয়ব সম্পর্কে তাদের একটা ধারণা তৈরী হয় যা আপনাকে নিরাপদ করে।

আবার অন্ধকার রাস্তাতে, আরো শক্তিশালী কিছু প্রয়োজন। গত কয়েক বছরে লাইটের বানিজ্যিক বাজারে এক সরব বিপ্লব ঘটে গেছে। এলইডি লাইট যা মোলায়েম ভাবে তীব্র আলো ছাড়ায় চারপাশে এবং লিথিয়াম আয়ন রিচার্জেবল ব্যাটারি সম্বলিত যা বিপুল শক্তি ধারণ করতে সক্ষম।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এলইডি লাইটগুলো মাউন্টেইন বাইক রাইডাররা ব্যবহার করে। যদি তাদের রাতে রাইড করতে হয় তাহলে এলইডি লাইট যেমন সহজেই পথের অন্ধকার দূর করতে পারে তেমনি বহু দূর থেকে এই লাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করাও সম্ভব।

স্পেয়ার টিউবস

যারা রাস্তা নেই তেমন এমন অঞ্চলে, যেমন পাহাড়ে কিংবা বনাঞ্চলে রাইড করতে যান প্রায়ই, সাইকেলের চাকার টিউব যে কোন সময় ফেঁসে যাওয়া মোটেই অস্বাভাবিক কোন ব্যাপার নয়।

স্পেয়ার টিউবস ; Image Source: bikeradar.com

তাই এমন লং রাইডে বেরুলে স্পেয়ার টিউব সাথে রাখা জরুরী।

টুলস

স্পেয়ার টিউব থাকলেই শুধু হবে না, তা লাগানোর জন্য যন্ত্রপাতির প্রয়োজন। ছয় অথবা আট আইটেমে সাইকেল টুলস মাল্টিটাস্ক প্যাক পাওয়া যায়, যা সকল রাইডারেরই কিনে রাখা উচিৎ।

মাল্টি টুলস ; Image Source: bikeradar.com

শুধু টিউব বদলে স্পেয়ার টিউব লাগাতেই না, অন্যান্য অনেক সাধারণ কাজ মেকানিক ছাড়াই নিজে নিজে করে ফেলা সম্ভব।

পাম্প

বাজারে বিভিন্ন ধরণের এবং আকারের পাম্প পাওয়া যায় টিউবে হাওয়া দেয়ার জন্য। লং রাইডে বেরুলে সাথে নেয়ার জন্য পকেট পাম্প কিনে নিতে পারেন, সাইজে ছোট, দেখতেও সুন্দর।

পকেট পাম্প ; Image Source: bikeradar.com

তবে সাথে বহন করার প্রয়োজন না থাকলে আমাদের পরামর্শ থাকবে ফুল সাইজ পাম্পই কিনতে, কারণ ছোট পাম্প দিয়ে টিউবে হাওয়া দিতে প্রচুর শক্তি এবং সময়ের অপচয় হয়।

টিউব পাম্পের ব্যপারে আপনার সাইকেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নিয়ম নির্দেশনা অনুসরণ করুন, অতিরিক্ত কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে কম হাওয়ার টিউব, দুটোই ক্ষতিকর এবং বিপদজনক। 

হেলমেট

সাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে হেলমেট কী আসলেই প্রয়োজন? 

এই প্রশ্নটা প্রায় সকল নতুন এবং পুরনো রাইডারের মনেই উঁকি দেয়। এ বিতর্কও চলে আসছে বহুদিন ধরে। আসলে ব্যাপারটা নির্ভর করে আপনার উপরে, আপনি কোথায় রাইড করবেন, কী ধরণের রাইডে যাবেন!

হেলমেট ; Image Source: gadget.net

মাউন্টেইন রাইডে অবশ্যই হেলমেট গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু রাস্তা অনিরাপদ, নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক কঠিন, তাই নিজেকে নিরাপদ রাখা জরুরী এসব ক্ষেত্রে।

আবার শহরে দুটো ব্যাপার হতে পারে, ইউরোপিয়ান অনেক শহর বেশ খোলামেলা, সেসব জায়গায় ট্রাফিক রুলস কড়া ভাবে মানতে বাধ্য করা হয়, এসব রাস্তায় সাইকেলের জন্য আলাদা লেনও থাকে, এসব ক্ষেত্রে হেলমেট তেমন জরুরী নয়৷

আবার নিউইয়র্ক, টোকিও কিংবা ঢাকার মত জ্যামের নগরীতে, বিশেষত ঢাকায় যেখানে প্রায়ই ট্রাফিক রুলস ভাঙ্গা হয়, সাইকেল লেন থাকলেও কদাচিৎ সেটা শুধু সাইকেলের জন্য পাওয়া যায়, সেসব ক্ষেত্রে হেলমেট অবশ্যই প্রয়োজনীয় বলে নির্দেশনা দেয়া যায়৷

হেলমেট কেনার ক্ষেত্রে পরে, সম্ভব হলে পরে কিছুক্ষণ সাইকেল চালিয়ে ট্রায়াল দেয়া উচিৎ। খেয়াল রাখা উচিৎ রাস্তায় ফোকাস করতে কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা, কান কাভার করার পর শুনতে কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা, ঘাড় কিংবা অন্য কোথাও ব্যাথা বা অস্বস্তি হচ্ছে কিনা।

সাইক্লিং জুতা

সাইক্লিং এর জন্য জুতো তেমন জরুরী নয়, সাধারণ স্লিপার কিংবা কনভার্স পরেই শহরের ভেতর রাইডিং খুব ভালভাবেই সম্ভব। তবে লং রাইডে গেলে পায়ের আরামের জন্য জুতা কেনা যেতে পারে। 

সাইক্লিং জুতা ; Image Source: bikeradar.com

সাইক্লিং এর জন্য বিশেষ ধরণের জুতা পাওয়া যায় যা পায়ের পাতার সাথে লেগে থাকায় প্যাডেল করা সহজ হয়ে যায় এবং বিশেষ ধরণের সোলের কারণে জুতা বা পা প্যাডেল থেকে পিছলে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

সানগ্লাস

রোদের মধ্যে কিংবা বাতাসে রাইডিং করতে বেরুলে সানগ্লাস বেশ উপকারী হয়ে ওঠে, রোদের আলোতে তাকানোর কষ্ট যেমন লাঘব হয় তেমনি বাতাসে ধুলো চোখে যাওয়া থেকেও বাঁচা যায়।

সানগ্লাস ; Image Source: bikeradar.com

মাউন্টেইন রাইডে আইওয়ার আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি রাতেও, কারণ এসব এলাকাতে আলো জ্বালালে পোকা কীটপতঙ্গ উড়ে আসে, এদের থেকে চোখ বাঁচানোতে চশমার জুড়ি নেই৷

সাইক্লিং এর জন্য চারপাশ ঢেকে রাখে, এমন বিশেষ ধরণে গ্লাস পাওয়া যায়। রোদের জন্য রঙিন কোন চশমা এবং রাতের জন্য সাদা কাঁচের চশমা নিতে হবে।

এসব ছাড়াও আরো বিভিন্ন এক্সেসরিজ সাইকেল শপগুলোতে আপনি দেখতে পাবেন, তাদের বেশিরভাগই বিলাসী পণ্য, চাইলে নিতে পারেন, নিলে ক্ষতিও নেই আবার না নিলেও চলে যাবে এমন।

যেমন কতটা পথ চালানো হয়েছে, তা জানার জন্য বাইকে ডিভাইস লাগানো যায়।

কনুই, হাঁটু, কোমড়, ঘাড় রক্ষা করতে আলাদা আলাদা গার্ড পাওয়া যায়, হাতের জন্য পাওয়া যায় লেদার গ্লাভস, এমনকি আলাদা সাইকেল ক্লোথিংও পাওয়া যায়।

কী নেবেন, কোনটা রাখবেন, কোনটা বাদ যাবে সবকিছুই নির্ভর করছে আপনার উপর, আপনি আপনার প্রয়োজন বুঝে সঠিক জিনিসগুলো বেছে নেবেন।

আশা করা যায় আমাদের আর্টিকেলটি আপনার প্রয়োজনটা বোঝা সহজ করে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *