in

সর্বকালের সেরা ডিজাইনের ১১টি গাড়ি

প্রযুক্তি কখনোই স্থির নয়, প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল এবং অগ্রসরমান। আজ যে প্রযুক্তি একদমই নতুন, এক বছর পর নতুন প্রযুক্তি আসার পর একেই মনে হবে পুরনো, একঘেয়ে। সৌন্দর্য ব্যাপারটা আবার অন্যরকম, ধ্রুবক ধরণের। যা আজ সুন্দর, তা এক বছর পরেও সুন্দর, একশ বছর পরেও সুন্দরই।

পৃথিবীতে গাড়ির বাজারে ব্যাপারটা আরো বেশি স্পষ্ট, প্রযুক্তির বদৌলতে গাড়ি বিক্রি হয় এবং তা সর্বোচ্চ পর্যায়েই, তবে নতুন প্রযুক্তি বাজারে এলেই একরকম অকেজো হয়ে যায় অবিক্রিত গাড়িগুলো।

গাড়ির ব্র্যান্ডগুলোও প্রতিবছর নতুন মডেল কিংবা আগের মডেলের আপডেটেড ভার্সন নিয়েই আসে। তবে যেসব গাড়ি দেখতে সুন্দর, চোখে লাগার মত, তেমন গাড়ি বছরের পর বছর ধরে বিক্রি হতেই থাকে, বিক্রি হয় শতবর্ষ ধরে। কারণ মানুষের সৌন্দর্য চিরস্থায়ী না হলেও গাড়ির সৌন্দর্য বদলে যায় না, সৌন্দর্য ধ্রুবক। আজ আমরা সর্বকালের সবচেয়ে সুন্দর ১১ ডিজাইনের গাড়ি নিয়েই আলোচনা করবো,

১৯৫৪ মার্সিডিজ বেন্জ ৩০০এসএল (1954 Mercedes Benz 300SL)

আপনি যদি গাড়ি ভালোবেসে থাকে এবং আপনার পকেটে টাকার কমতি না থেকে থাকে, তাহলে এই গাড়িটি হবে পরম পছন্দের একটি যা যে কোন গাড়িপ্রেমীই নিজের সংগ্রহে রাখতে চাইবে।

মার্সিডিজ বেন্জ ৩০০ এসএল ; Image Source: beautifullife.info

মার্সিডিজ বেন্জ ৩০০ এসএল ক্লাস গ্রান্ড ট্যুরারগুলোর মধ্যে অগ্রগামী এবং সেই সময়ের সবচেয়ে দ্রুতগামী গাড়ি। ১৯৫৪ সালে বের হওয়া গাড়িটি ছিল বেস্টন করা দরজা সম্পন্ন দুই সিটের গাড়ি।

ডেইমলার বেন্জের ডিজাইন করা চমৎকার ২১২ এইচপির গাড়িটি সর্বোচ্চ গতি তুলতে পারত প্রায় ২৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রতি ঘন্টায়।

ফেরারি ২৫০ জিটিও ( Ferrari 250 GTO)

১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৪ সালে তৈরী করা ফেরারির এই গাড়িটি স্টাইল এবং ডিজাইন করেছেন জিওত বিজ্জারিনি এবং সার্জিও স্কাগলিইট্টি। ২৫০ জিটিও মডেলের এই ফেরারিটি সবচেয়ে আকাঙ্খিত ফেরারি। শৈল্পিক ডিজাইনের এ গাড়িটি পেতে পকেট থেকে খসাতে হবে বেশ কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড।

ফেরারি ২৫০ জিটিও ; Image Source: beautifullife.info

ফেরারির এই গাড়িটি মূলত রেসিং কারের পরিশোধিত রূপ। ৩০০ বিএইচপি ক্ষমতা সম্পন্ন ইন্জিনের গাড়িটি ৬.১ সেকেন্ডের মধ্যে ৬০ মাইল / ঘন্টা পর্যন্ত গতি তুলে ফেলতে পারে। গাড়িটির সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ১৫৮ মাইল।

এস্টন মার্টিন ডিবি৫ (Aston Martin DB5)

যদিও প্রথম নয়, তবে ডিবি৫ জেমস বন্ডের গাড়ি হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। গাড়িটি প্রথম দেখা যায় গডফিংগার মুভিতে।

এস্টন মার্টিন ডিবি৫ ; Image Source: beautifullife.info

ডিবি৫ এর যান্ত্রিক উপাদানের কারণে গাড়িটি হয়ে উঠেছে বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, প্রভাবশালী কিন্তু নিরুদ্বেগ চলাচল গাড়িটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে রাস্তায় চলা মানুষের কাছে।

সর্বোচ্চ গতি ১৪৩ মাইল প্রতি ঘন্টায়, পাওয়ার রেন্জ ২৮২ বিএইচপি পর্যন্ত ৫,৫০০ আরপিএমে।

এস্টন মার্টিন ডিবি৫ একটি ব্রিটিশ বিলাসবহুল গাড়ি যেটি ডিজাইন করেছেন ইটালিয়ান গাড়ি নির্মাতা ক্যারোজেরিয়া ট্যুরিং সুপারলেগেরা।

গাড়িটি লন্চ করা হয় ১৯৬৩ সালে, এটা আসলে এস্টন মার্টিন সিরিজের ডিবি৪ এর ডেভেলপড ভার্সন।

গাড়িটি বিংশ শতাব্দীর ইউরোপ, বিশেষ করে ব্রিটেনে এমন জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল যে ডিবি৫ থাকা হয়ে উঠেছিল আভিজাত্যের প্রতীক।

আলফা রোমিও ৮সি কম্পিটাইজন (Alfa Romeo 8C Compitizione)

গাড়িটি প্রথম প্রদর্শিত হয় একটি কনসেপ্ট কার হিসেবে ২০০৩ সালের ফ্রাঙ্কফুর্ট মোটর শো’তে, পরবর্তীতে গাড়িটি পাবলিকলি বিক্রির জন্য ছাড়া হয় ২০০৭ সালে।

আলফা রোমিও ৮সি কম্পিটাইজন ; Image Source: beautifullife.info

ইটালিয়ান অটোমেকারের ডিজাইনে তৈরী চমৎকার এই গাড়িটির সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ২৯২ কিলোমিটার (১৮১ মাইল / ঘন্টা) এবং ৭০০০ আরপিএমে গাড়িটি ৩৩১ কিলোওয়াট (৪৫০ পিএস, ৪৪৪ এইচপি) ক্ষমতাসম্পন্ন।

আলফা রোমিও গাড়িটি নিঃসন্দেহে সর্বকালের সবচেয়ে সুন্দর ডিজাইনের গাড়িগুলোর মধ্যে একটি।

মার্সিডিজ বেন্জ এসএসকে (Mercedes Benz SSK)

মার্সিডিজ বেন্জ প্রথম এসএসকে মডেলটি ম্যানুফ্যাকচার করে ১৯২৮ এবং ১৯৩২ সালে।

মার্সিডিজ বেন্জ এসএসকে ; Image Source: beautifullife.info

ফার্ডিনান্ড পোর্সের ডিজাইন করা গাড়িটির সর্বোচ্চ গতি ১৯৩.১ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায় (১২০ মাইল / ঘন্টা), ৩৪০০ আরপিএমে ২২৩.৭ কিলোওয়াট / ৩০০ বিএইচপি ক্ষমতা সম্পন্ন।

রিভার্টেড (উল্টো দিকে ছোটা) স্পোর্টস কারগুলোর মধ্যে এসএসকে সেরাদের একটি এবং এর স্বতন্ত্র আকর্ষণীয় বডি একে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছিল মানুষের কাছে।

দুর্দান্ত পারফর্মেন্স এবং প্রতিযোগিতায় অসাধারণ সাফল্য গাড়িটিকে করে তুলেছিল কেনার আগে সবচেয়ে বেশি বিবেচ্য গাড়ি ওই সময়ে।

জাগুয়ার এক্সকে১২০ (Jaguar XK120)

দুজন মানুষের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন উন্মুক্ত ছাদের গাড়িটির বডি কিছুটা লম্বাটে। স্পোর্টি এবং ফ্লাশি কনসেপ্টের পরেও, গাড়িটিতে বোল্ড কালার ব্যবহার করা হয়েছে এবং এমনভাবে পলিশ করা হয়েছে যে গাড়িটি দেখতে মোলায়েম এবং শান্তই মনে হয়।

জাগুয়ার এক্সকে১২০ ; Image Source: timescolonist.com

জাগুয়ার এক্সকে১২০ গাড়িটি একটি র্স্পোর্টস কার যেটি ১৯৪৮ এবং ১৯৫৪ সালে ম্যানুফ্যাকচার করেছে জাগুয়ার।

৫০০০ আরপিএমে ১৬০ বিএইচপি (১১৯কিলোওয়াট ; ১৬২ পিএস) ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়িটির সর্বোচ্চ গতি প্রতি ঘন্টায় ১৩২.৫৯৬ মাইল (২১৩.৩৯৩ কিলোমিটার / ঘন্টা)।

জাগুয়ার এক্সকে১২০ গাড়িটির ডিজাইন অদ্বিতীয় এবং অতুলনীয়। জাগুয়ারের অন্য সব মডেলের উপরে রাখা হয় এটিকে সুপ্রিম মডেল হিসেবে।

ভিন্নমত থাকতেই পারে, তবে এক্সকে১২০ গাড়িটি জাগুয়ারকে অন্য এক মাত্রায় পৌছে দিয়েছিল যা জাগুয়ারকে বাধ্য করেছে পরের মডেলগুলো গুরুত্ব দিয়ে বের করতে।

ফেরারি লাফেরারি (Ferrari Laferrari)

ফেরারির একটি হাইব্রিড সুপারকারের লিমিটেড এডিশন লাফেরারি। গাড়িটি অফিশিয়ালি প্রথম প্রদর্শিত হয় ২০১৩ জেনেভা অটো শো’তে।

ফেরারি লাফেরারি ; Image Source: beautifullife.com

সেন্ট্রো স্টাইল ফেরারির অধীনের গাড়িটির ডিজাইন করেছেন ফ্ল্যাভিও মন্জোনি।

৭৮৯ এইচপি ক্ষমতা সম্পন্ন গাড়িটির সর্বোচ্চ ২১৭ মাইল / ঘন্টা ( ৩৪৯ কিলোমিটার / ঘন্টা) বেগে ছুটতে সক্ষম।

লাফেরারি মূলত একটি হালকা হাইব্রিড ফেরারি, যা ক্ষমতার সর্বোচ্চ আউটপুট দেয় অন্যান্য যে কোন ফেরারির তুলনায় তবে একইসাথে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ফুয়েল বেশি দ্রুত খরচ করে।

অডি আর৮ (Audi R8)

যখন অডি আর৮ রাস্তায় চলতে শুরু করে, রাস্তার অন্য সকলের দৃষ্টি যেকোনভাবেই হোক আকর্ষণ করতে শুরু করে।

অডি আর৮ ; Image Source: beautifullife.com

গাড়িটির মুগ্ধতা ছড়ানো কৌণিক লাইনগুলো হৃদয়গ্রাহী, এর গ্লাসে ঢাকা ইন্জিন গাড়িটির একটি চিত্তাকর্ষক রূপ নিয়ে উপস্থিত হয় যে তখন অন্য কোন দিকে তাকানো কষ্টকর হয়ে পড়ে৷

ফ্রাংক ল্যাম্বার্টি এবং ওয়াল্টার ডি সিলভার ডিজাইন করা গাড়িটি প্রথম লন্চ করা হয় ২০০৬ সালে৷

৫৪০ এইচপি ক্ষমতা সম্পন্ন গাড়িটির সর্বোচ্চ গতি প্রতি ঘন্টায় ৩১৬ কিলোমিটার (১৯৬.৪ মাইল / ঘন্টা

বুগাট্টি ভেইরন (Bugatti Veyron)

বুগাট্টি ভেইরন ইবি ১৬.৪ একটি মাঝারি ইন্জিনের স্পোর্টস কার। গাড়িটি ডিজাইন এবং ডেভেলপ করেছে জার্মানির ভক্সওয়াগন গ্রুপ, ম্যানুফ্যাকচারড করেছে ফ্রান্সের বুগাট্টি অটোমোবাইল এস.এ.সিন মোলসেইম।

বুগাট্টি ভেইরন ; Image Source: beautifullife.com

২০১৪ সালে রিলিজ হওয়া গাড়িটি ৬০০০ আরপিএমে ৭৩৬ কিলোওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন এবং সর্বোচ্চ গতি প্রতি ঘন্টায় ৪০৭ কিলোমিটার।

ভেইরনের ডিজাইন এবং পারফরম্যান্স অটোমোটিভের ধারণাকেই অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

জাগুয়ার এফ-টাইপ ক্যুপে (JAGUAR F-TYPE COUPE)

এটি একটি দুই সিটের স্পোর্টস কার, জাগুয়ার এফ টাইপ মূলত এক্সকে’র সাথে একটা সেতুবন্ধন রচনা করেছে।

ম্যাথু বেভান এবং ইয়ান কলাম গাড়িটি ২০১০-১১ সালে ডিজাইন করেন। গাড়িটির পারফরম্যান্স অসাধারণ, দিনকে দিন এর হ্যান্ডলিং আরো বেশি স্থির এবং প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে হাতের সাথে।

জাগুয়ার এফ-টাইপ ক্যুপে ; Image Source: beautifullife.com

এফ-টাইপ একটি সত্যিকারের জাগুয়ার স্পোর্টস কার, স্নায়ু রুদ্ধ অথচ ক্লান্তিহীন পারফরম্যান্স পাওয়া যায় গাড়িটি থেকে, যা সময় এবং প্রতিদিনের ব্যবহারের সাথে সাথে এতো বেশি প্রফুল্ল হয়ে ওঠে যেন হাতের সাথে কথা বলতে শুরু করে।

এ৩.০ লিটার ভি৬ ৩৪০ এইচপি ইন্জিনের গাড়িটি রেসে চমৎকার পারফরম্যান্স তো বটেই, প্রতিদিনের ব্যবহারেও দারুণ চমৎকার। গাড়িটি সর্বোচ্চ গতি ১৭১ মাইল প্রতি ঘন্টায় (২৭৫ কিলোমিটার / ঘন্টা)।

পোর্শে ক্যারেরা জিটি (Porsche Carrera GT)

পোর্শে ক্যারেরা জিটি একটি সুপার কার, গাড়িটি ২০০৪ এবং ২০০৭ সালে জার্মানীর লিইপজিগ শহরে পোর্শে নিজেরাই প্রথম ম্যানুফ্যাকচার করে৷

পোর্শে ক্যারেরা জিটি ; Image Source: blog.dupontregistry.com

৮০০০ আরপিএমে ৬০৫ বিপিএইচ ক্ষমতা সম্পন্ন ইন্জিনে গাড়িটি সর্বোচ্চ ২০০ মাইল (৩৩০ কিলোমিটার) গতিতে চলতে পারে ঘন্টায়।

পোর্শে ক্যারেরা জিটি শুধু অসাধারণ একটি গাড়ি নয়, সুপারকার হিসেবে একে প্রায় বিরল প্রজাতির ধরা যেতে পারে৷ গাড়িটির পারফরম্যান্স অবর্ণনীয় কিন্তু একই সাথে ভীষণ প্রলুব্ধকর, অসাধারণ ভারসম্য এবং অতিদারুণ ভাবে ব্যবস্থা করা যান্ত্রিক ব্যাপারগুলো।

প্রথমে যদিও বলেছিলাম সুন্দর গাড়িগুলোকেই তুলে ধরবো এই তালিকায়, কিন্তু তালিকাটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, সৌন্দর্যের সাথে সাথে পারফরম্যান্সও অসাধারণ থাকাতেই গাড়িগুলো চলে গেছে অন্য এক উচ্চতায়। মানুষ মনে রেখেছে গাড়িগুলোকে, এদের বেশির ভাগ পুরনো গাড়ি বিক্রি হয় মূল দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে, কখনো কখনো নিলামেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *